বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝে কিছুক্ষণ ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করা বা স্টোরি দেখা এখন অনেকেরই অভ্যাস। কিন্তু অনেক সময় আমরা এমন কিছু মানুষের ‘ক্লোজ ফ্রেন্ডস’ তালিকায় ঢুকে পড়ি, যাদের ব্যক্তিগত জীবন বা স্টোরি দেখার বিশেষ আগ্রহ আমাদের থাকে না। এতদিন চাইলেও অন্যের সেই ব্যক্তিগত তালিকা থেকে নিজের নাম কাটানোর কোনো সুযোগ ছিল না। তবে ব্যবহারকারীদের সেই আক্ষেপ মেটাতে এবার বড়সড় পরিবর্তন নিয়ে আসছে মেটা। এখন থেকে আপনি চাইলেই অন্য কারও ‘ক্লোজ ফ্রেন্ডস’ তালিকা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবেন।
ইনস্টাগ্রামের এই নতুন ফিচারের খবরটি প্রযুক্তি বিশ্বে বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে যারা ডিজিটাল প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে সচেতন, তাদের জন্য এটি একটি স্বস্তির খবর। মেটা জানিয়েছে, এই ফিচারটি নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে এবং খুব শীঘ্রই এটি বিশ্বজুড়ে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হতে পারে। আজকের প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব এই ফিচারের বিস্তারিত এবং কেন এটি ব্যবহারকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের ডিজিটাল সীমানা এখন আপনার হাতে
ইনস্টাগ্রামের ‘ক্লোজ ফ্রেন্ডস’ ফিচারটি প্রথম চালু হয়েছিল ২০১৮ সালে। তখন থেকেই এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো শেয়ার করা। সাধারণ সব ফলোয়ারদের ভিড়ে নিজের পছন্দের বা কাছের মানুষদের নিয়ে একটি আলাদা ছোট জগত তৈরি করাই ছিল এর লক্ষ্য। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেক সময় পরিচিত বা আধো-পরিচিত মানুষজন আপনাকে তাদের ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্টে যুক্ত করে নেয়। এতে করে তাদের এমন সব ব্যক্তিগত স্টোরি বা রিলস আপনার ফিডে চলে আসে, যা হয়তো আপনি দেখতে চান না।
এতদিন পর্যন্ত এই তালিকায় কাউকে রাখা বা না রাখার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল কেবল অ্যাকাউন্টের মালিকের হাতে। অর্থাৎ, কেউ যদি আপনাকে তার ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্টে ঢোকায়, তবে আপনি নিজে থেকে বের হতে পারতেন না। আপনাকে হয় সেই ব্যক্তিকে আনফলো করতে হতো, নয়তো তার স্টোরি মিউট করে রাখতে হতো। কিন্তু নতুন এই আপডেটের ফলে ব্যবহারকারীরা এখন নিজেদের ডিজিটাল সীমানা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবেন। কেউ আপনাকে লিস্টে রাখলেই আপনি সেখানে থাকতে বাধ্য নন।
আরো পড়ুন:-এক চার্জে চলবে ৩ দিন! লঞ্চ হলো রেডমি টার্বো ৫ ম্যাক্স
কেন এই ফিচার এত গুরুত্বপূর্ণ?
সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই ডিজিটাল বাউন্ডারি বা সীমানা নিয়ে কথা বলে আসছেন। অনেক সময় আমরা সামাজিক চাপে বা সম্পর্কের খাতিরে কাউকে সরাসরি কিছু বলতে পারি না। যেমন, অফিসের কোনো সহকর্মী বা দূর সম্পর্কের আত্মীয় যদি আপনাকে তাদের ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্টে রাখে, তবে তাদের ব্যক্তিগত সব পোস্ট দেখাটা অনেকের জন্যই অস্বস্তিকর হতে পারে।
নতুন ফিচারের মাধ্যমে কোনো ঝগড়া বা সরাসরি সংঘাত ছাড়াই আপনি সেই তালিকা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবেন। এতে করে আপনার ইনস্টাগ্রাম ফিড আপনার পছন্দ অনুযায়ী পরিষ্কার থাকবে। মেটা মনে করে, ব্যবহারকারীদের হাতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দিলে প্ল্যাটফর্মটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং মানুষ আরও স্বচ্ছন্দে এটি ব্যবহার করতে পারবে।
স্ন্যাপচ্যাট বনাম ইনস্টাগ্রাম: কে এগিয়ে?
ইনস্টাগ্রামের এই নতুন ফিচারটি কিন্তু একেবারেই অভিনব নয়। এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী স্ন্যাপচ্যাটে অনেক আগেই এ ধরনের সুবিধা চালু রয়েছে। সেখানে ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই অন্যের প্রাইভেট স্টোরি থেকে নিজেদের রিমুভ করে নিতে পারেন। স্ন্যাপচ্যাটের তরুণ ব্যবহারকারীদের কাছে এই অপশনটি বেশ জনপ্রিয়।
এতদিন ইনস্টাগ্রাম এই দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ২০২৬ সালের এই সময়ে মেটা নিজেদের প্ল্যাটফর্মকে আরও ব্যবহারকারী-বান্ধব করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং ব্যবহারকারীদের ধরে রাখতে স্ন্যাপচ্যাটের মতো ফিচারগুলো এখন ইনস্টাগ্রামেও নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে।
আরো পড়ুন:-চ্যাটজিপিটিতে কেন মাস্কের গ্রকিপিডিয়া? চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস
কীভাবে কাজ করবে এই নতুন অপশন?
অপ্রকাশিত বিভিন্ন ফিচার খুঁজে বের করার জন্য জনপ্রিয় রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার আলেসান্দ্রো পালুজ্জি এই তথ্যটি সামনে এনেছেন। তিনি অ্যাপের ইন্টারনাল কোড বিশ্লেষণ করে একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, কারও ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্টের স্টোরি দেখার সময় বা প্রোফাইল সেকশন থেকে একটি নতুন বাটন বা অপশন পাওয়া যাবে।
সেখানে ‘লিভ ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্ট’ (Leave Close Friends List) নামে একটি অপশন থাকবে। এটিতে ক্লিক করলেই আপনি সেই তালিকা থেকে বের হয়ে যাবেন। এরপর থেকে আপনি আর সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা লিমিটেড অডিয়েন্সের জন্য দেওয়া কোনো পোস্ট দেখতে পাবেন না। তবে আপনি যদি ভবিষ্যতে আবার সেই ব্যক্তির ক্লোজ ফ্রেন্ডস হতে চান, তবে সেই ব্যবহারকারীকে নতুন করে আপনাকে ইনভাইট বা অ্যাড করতে হবে।
সামাজিক অস্বস্তি নাকি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা?
এই ফিচারটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষের অধিকার থাকা উচিত সে কার ব্যক্তিগত কনটেন্ট দেখবে আর কার দেখবে না। তবে অনেকে আবার মনে করছেন, এটি কিছুটা সামাজিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
ধরুন, আপনার কোনো কাছের বন্ধু যদি দেখে যে আপনি নিজে থেকে তার ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্ট ছেড়ে দিয়েছেন, তবে সে মনে কষ্ট পেতে পারে। এটি ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের সবসময় সবার মন রক্ষা করে চলা সম্ভব নয়। নিজের মানসিক শান্তি এবং ডিজিটাল হেলথ বজায় রাখতে এই ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় জরুরি হয়ে পড়ে।
আরো পড়ুন:-আপনার সন্তান কি ঝুঁকিতে? মেটা ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা!
ইনস্টাগ্রাম সাবস্ক্রিপশন: টাকা খরচ করে মিলবে বিশেষ সুবিধা?
শুধু ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্ট ছাড়ার সুযোগই নয়, মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য নতুন কিছু পরিকল্পনা করছে। খবর পাওয়া গেছে যে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ‘প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন’ মডেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট মাসিক ফির বিনিময়ে এমন কিছু সুবিধা পাবেন যা সাধারণ ব্যবহারকারীরা পাবেন না।
যদিও মেটা এখনও এর বিস্তারিত প্রকাশ করেনি, তবে পালুজ্জির ইঙ্গিত অনুযায়ী এই সাবস্ক্রিপশন ফিচারের আওতায় অনেক চমক থাকতে পারে। যেমন, এখন ইনস্টাগ্রামে কেবল একটিই ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্ট তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীরা অসংখ্য আলাদা আলাদা লিস্ট তৈরি করতে পারবেন। এতে করে পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কনটেন্ট শেয়ার করা সহজ হবে।
অসীম লিস্ট ও গোস্ট মোড: প্রিমিয়াম সংস্করণের চমক
প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনে আরও কিছু আকর্ষণীয় ফিচারের কথা শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— কে আপনাকে ফলো ব্যাক করেনি তা সরাসরি দেখা। বর্তমানে এটি দেখার জন্য থার্ড-পার্টি অ্যাপ ব্যবহার করতে হয়, যা অ্যাকাউন্টের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ইনস্টাগ্রাম নিজেই এই সুবিধা দিলে ব্যবহারকারীরা বেশ উপকৃত হবেন।
এছাড়া স্টোরি দেখার ক্ষেত্রে ‘গোস্ট মোড’ বা ইনকগনিটো মোড আসারও সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, আপনি কারও স্টোরি দেখবেন কিন্তু তিনি জানতেও পারবেন না যে আপনি তা দেখেছেন। বর্তমানে এই ধরনের কাজ করার জন্য অনেককে নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। কিন্তু অফিশিয়াল ফিচারে এটি যুক্ত হলে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
আরো পড়ুন:-আইফোন ১৭ প্রো-এর কাছে ধরাশায়ী শাওমি ১৭ প্রো ম্যাক্স! ক্যামেরায় বড় গলদ?
মেটার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও ডিজিটাল গোল্ড মাইন
২০২৬ সালে এসে মেটা তাদের বিজনেস মডেলে বড় পরিবর্তন আনছে। শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সাবস্ক্রিপশন ফি নেওয়ার দিকে তারা ঝুঁকছে। ইউটিউব প্রিমিয়াম বা এক্স (সাবেক টুইটার) ব্লু-এর সফলতার পর মেটা এই পথে হাঁটছে।
মেটার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্ল্যাটফর্মের মূল অভিজ্ঞতা সবার জন্য বিনামূল্যে রাখা হবে। কিন্তু যারা বাড়তি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং এক্সক্লুসিভ ফিচার চান, তাদের জন্য পেইড সার্ভিস চালু করা হবে। এর ফলে কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং সাধারণ ইউজারদের মধ্যে এক ধরনের ডিজিটাল বিভাজন তৈরি হতে পারে, তবে এটি মেটার আয়ের নতুন এক উৎস বা ডিজিটাল গোল্ড মাইন হিসেবে কাজ করবে।
উপসংহার: সামাজিক মাধ্যমে স্বচ্ছতার নতুন যুগ
ইনস্টাগ্রামের ‘ক্লোজ ফ্রেন্ডস’ থেকে নিজে সরে যাওয়ার সুযোগ এবং নতুন সাবস্ক্রিপশন মডেল— সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আমরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। এখন আর কেবল স্ক্রল করা বা লাইক দেওয়ার মধ্যে আমাদের অভিজ্ঞতা সীমাবদ্ধ নয়। নিজের ডিজিটাল জগতকে নিজের মতো করে সাজানোর ক্ষমতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।
আরো পড়ুন:-ভুল ইমেইলে ফাঁস হলো আমাজনের ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর
তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল বাউন্ডারি যেন বাস্তবের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। মেটার এই নতুন ফিচারগুলো শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জীবনে কতটা স্বস্তি আনে, তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আরো জানতে ভিজিট করুন।