ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজছে দেশজুড়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এরই মধ্যে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি আগামী শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি ২০২৬) তাদের বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করতে যাচ্ছে।
তারুণ্যনির্ভর এই দলটির ইশতেহারে থাকছে চমকপ্রদ সব অঙ্গীকার। বিশেষ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে তাদের রাজনৈতিক রূপরেখা। এনসিপি এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক হিসেবে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। দলটির ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচন ও তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে কী কী থাকছে, তা নিয়ে পাঠকদের জন্য বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
সুশাসন, সংস্কার ও সার্বভৌমত্ব: এনসিপির মূল স্লোগান
জাতীয় নাগরিক পার্টির এবারের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল ভিত্তি হচ্ছে তিনটি শব্দ— সুশাসন, সংস্কার ও সার্বভৌমত্ব। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে গুণগত পরিবর্তন আনাই তাদের মূল লক্ষ্য। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার রয়েছে এই ইশতেহারে।
ইশতেহারে দেশের নাজুক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে বিশেষ প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। এনসিপি মনে করে, সাময়িক ত্রাণ বা সহায়তা দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। তাই তারা লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি বরাদ্দ ও কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচির ওপর জোর দিচ্ছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর।
আরো পড়ুন:-ভারতের তেল কেনা নিয়ে বড় খবর! মোদিকে নিয়ে যা বললেন ট্রাম্প
তরুণদের কর্মসংস্থান ও আইসিটি বিপ্লব
এনসিপির ইশতেহারে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কর্মসংস্থান। সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করতে আইসিটি খাতে তরুণদের দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করতে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে দলটি।
বেকারত্ব দূর করতে তারা স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদের মতে, তরুণরাই হবে নতুন বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি। তাই তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করাকেই দলটির ইশতেহারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক
প্রশাসনিক দুর্নীতি রোধে এনসিপি এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব নিয়ে আসছে। তাদের ইশতেহার অনুযায়ী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি (মন্ত্রী-এমপি) এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের হিসাব একটি নির্দিষ্ট সরকারি পোর্টালে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হবে। এই তথ্যগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে যাতে নাগরিকরা তাদের প্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন।
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে তারা ‘জাতীয় ডিজিটাল সার্ভার’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে সরকারি সেবাগুলো আরও সহজলভ্য ও গতিশীল হবে। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটানোই এনসিপির মূল উদ্দেশ্য।
আরো পড়ুন:-আপিলেও খারিজ! নির্বাচন করতে পারবেন না মঞ্জুরুল মুন্সী
অর্থনৈতিক সংস্কার ও কর কাঠামোতে পরিবর্তন
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এনসিপি এক শক্তিশালী সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে ঢেলে সাজানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশে সহজ শর্তে অর্থায়নের পরিকল্পনা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কর কাঠামোর ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে দলটি। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি বাড়াতে তারা উচ্চবিত্তদের ওপর যৌক্তিক কর আরোপের প্রস্তাব করেছে। তবে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি। এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে বৈপ্লবিক সেবা: ‘মোবাইল আইসিইউ’
স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নে এনসিপি এক অনন্য পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি উপজেলায় বিশেষায়িত ‘মোবাইল অ্যাম্বুলেন্স’ সেবা চালু করা হবে। এই অ্যাম্বুলেন্সগুলোর বিশেষত্ব হলো, রোগী তোলার সাথে সাথেই সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করা যাবে।
সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য এই অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে পোর্টেবল আইসিইউ (ICU) ও সিসিইউ (CCU) সুবিধা থাকবে। বড় বড় হাসপাতাল বা অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে তাৎক্ষণিক জীবন রক্ষাকারী সেবা সহজলভ্য করাকেই এনসিপি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যগত তথ্য সংরক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য ডাটাবেজ স্থাপন করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
আরো পড়ুন:-বাণিজ্য মেলায় ৩৯৩ কোটির রেকর্ড বিক্রি: পর্দা নামল আসরের
শ্রম অধিকার ও মানবিক কর্মপরিবেশ
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় এনসিপি ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ প্রথা প্রবর্তনের ঘোষণা দিচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ৬ মাসের বাধ্যতামূলক মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি ১ মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটির বিধান রাখা হবে।
কর্মজীবী মায়েদের শিশুদের যত্নে সারা দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক আধুনিক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে। এনসিপি বিশ্বাস করে, একটি মানবিক কর্মপরিবেশই পারে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং সামাজিক সমতা নিশ্চিত করতে। শ্রমিক ও কৃষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে দলটি বদ্ধপরিকর।
কৃষি বাজার ও ‘কমিউনিটি এক্সচেঞ্জ’ প্রবর্তন
কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে এনসিপি ‘কমিউনিটি মার্কেট’ বা ‘এক্সচেঞ্জ মার্কেট’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। কৃষকরা একটি ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি পণ্যের বাজারমূল্য যাচাই করতে পারবেন। তারা উৎপাদনস্থল থেকেই সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পাবেন।
এই ব্যবস্থার ফলে কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং শহরে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে ‘সিস্টেম লস’ কমিয়ে আনা হবে। এটি কৃষকের মুনাফা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় খাদ্য সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহায়ক হবে।
আরো পড়ুন:-শীতে বাইক রাইডিং: অজান্তে করছেন যে ৫টি মারাত্মক ভুল!
প্রবাসী ও এভিয়েশন খাতের আধুনিকায়ন
দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সম্মানে এনসিপি প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ‘গুচ্ছ পরিকল্পনা’ হাতে নিয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী এবং হয়রানিমুক্ত করার রূপরেখা ইশতেহারে থাকছে। প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের এভিয়েশন সেক্টরকে এমনভাবে আধুনিকায়ন করা হবে যাতে এটি দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা সহজ করতে বিশেষ টার্মিনাল ও সেবা কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এনসিপি।
উপসংহার: নতুন বাংলাদেশের পথে এনসিপি
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এই ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপ। ২০২৫ সালের ২৪ দফার আলোকে তৈরি করা এই হালনাগাদ ইশতেহার তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে তৈরি হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার এনসিপি করেছে, তা সফল হলে দেশের সামগ্রিক চেহারাই বদলে যেতে পারে।
আরো পড়ুন:-ইনস্টাগ্রামে বড় চমক: অন্যের ক্লোজ ফ্রেন্ডস লিস্ট থেকে বের হবেন যেভাবে!
দলটি মনে করে, তাদের ইশতেহার হবে আগামীর রাজনীতির একটি দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা। ক্ষমতার মোহ নয়, বরং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির আলোকে দেশ পরিচালনা নিশ্চিত করাই এনসিপির মূল লক্ষ্য। এখন দেখার বিষয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা এই তারুণ্যনির্ভর দলটির ওপর কতটা আস্থা রাখেন। আরো জানতে ভিজিট করুন।