বিশ্বখ্যাত মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড কেটিএম (KTM) এখন পুরোপুরি ভারতীয় অটোমোবাইল জায়ান্ট বাজাজ অটোর অধীনে। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের পর বাজাজ অস্ট্রিয়ার এই বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের শতভাগ মালিকানা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি যাবতীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা এবং শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে বাজাজ এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল।
বিশ্ব কাঁপানো কেটিএম এখন বাজাজের: ৯৬০০ কোটির চুক্তিতে মালিকানা বদল, মোটরসাইকেল দুনিয়ায় নতুন বিপ্লব!
অস্ট্রিয়ান মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কেটিএম-এর ওপর এখন থেকে বাজাজ অটোর একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে। গত ১৮ নভেম্বর সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কেটিএমের হোল্ডিং কোম্পানি ‘পিয়েরার বাজাজ এজি’র (PBAG) শতভাগ শেয়ার কিনে নিয়েছে বাজাজ। এই চুক্তির ফলে কোম্পানিটি থেকে পিয়েরার গ্রুপের অংশীদারিত্বের অবসান ঘটল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, বাজাজের এই বিশাল অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে তাদের আন্তর্জাতিক শাখা ‘বাজাজ অটো ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংস বিভি’। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজাজ এখন বিশ্বের প্রিমিয়াম বাইক বাজারে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করল। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে বাজাজের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যেভাবে এলো এই বিশাল মালিকানা
মূলত ২০২৬ সালের শুরু থেকেই কেটিএমের অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকট নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছিল। অস্ট্রীয় টেকওভার কমিশন ও ইউরোপিয়ান কমিশনের অনুমোদনের জন্য বাজাজকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া পার করতে হয়েছে। মে মাস থেকেই বাজাজ পিয়েরার ইন্ডাস্ট্রি এজির সাথে শেয়ার কেনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে।
অবশেষে প্রয়োজনীয় সব আইনি নোটিশ জারি এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর সবুজ সংকেত পাওয়ার পর বাজাজ অবশিষ্ট ৫০ হাজার ১০০টি শেয়ার কিনে নেয়। এর মাধ্যমে কেটিএমের মূল পরিচালনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত এখন থেকে এককভাবে ভারতের পুনেভিত্তিক এই কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রণ করবে।
আরো পড়ুন:-ইয়ামাহা এক্সএসআর ১৫৫ লঞ্চ হলো: জানুন দাম ও ফিচার
দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি ও বাজাজের ৮০০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা
কেটিএমের এই মালিকানা পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একটি বড় আর্থিক সংকটের গল্প। জনপ্রিয় অটোমোবাইল ব্লগ ‘রেভ জিলা’র তথ্যমতে, চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে কেটিএম বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছিল। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতেও ছিল।
সেই চরম দুঃসময়ে বাজাজ অটো প্রায় ৮০ কোটি ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা) অর্থ সহায়তা দিয়ে কেটিএমকে পুনরুজ্জীবিত করে। এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক সাহায্যের বিনিময়ে বাজাজ অবশিষ্ট শেয়ারগুলো কেনার বিশেষ সুযোগ বা ‘কল অপশন’ লাভ করে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই বাজাজ আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা রেসিং বাইক ব্র্যান্ডের পূর্ণ মালিক।
বিশ্ব মোটরসাইকেল বাজারে এর প্রভাব
বাজাজ এবং কেটিএমের সম্পর্ক দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে। এতদিন বাজাজ কেবল কেটিএমের বড় একটি অংশের মালিক ছিল এবং ভারতে তাদের বাইক উৎপাদন করত। এখন শতভাগ মালিকানা পাওয়ার ফলে কেটিএমের ভবিষ্যৎ মডেল এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন সরাসরি বাজাজ নিয়ন্ত্রণ করবে।
বিশেষ করে ১২৫ সিসি থেকে ৩৯০ সিসি ক্যাটাগরির ডিউক ও আরসি সিরিজ বিশ্বজুড়ে তরুণদের ক্রেজ। এখন বাজাজ চাইলে আরও কম খরচে এবং দ্রুততার সাথে কেটিএমের নতুন সব প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসতে পারবে। এটি কেবল ভারতের জন্য নয়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাইক প্রেমীদের জন্যও খুশির খবর হতে পারে।
আরো পড়ুন:-ব্লুটুথ হেলমেট কেন কিনবেন? জানুন এর অবিশ্বাস্য সব সুবিধা!
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নতুন মডেলের জল্পনা
কেটিএমের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর বাজাজ এখন হাই-পারফরম্যান্স ইলেকট্রিক বাইক তৈরির দিকে নজর দিতে পারে। ইউরোপীয় প্রযুক্তির সাথে বাজাজের সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যবস্থার মিলন ঘটলে ইলেকট্রিক ভেহিকেল (EV) সেক্টরে বড় ধরনের চমক আসতে পারে।
এছাড়া কেটিএমের অফ-রোড এবং অ্যাডভেঞ্চার সিরিজগুলোকে আরও আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে বাজাজের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেটিএমের শোরুম ও সার্ভিস সেন্টারগুলোতে এখন বাজাজের সরাসরি তদারকি থাকবে। এতে করে পার্টস বা যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজাজ অটোর এই অর্জন কেবল একটি ব্যবসায়িক চুক্তি নয়, এটি বিশ্ব বাজারে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং ও সক্ষমতার এক বিশাল জয়। কেটিএমের মতো একটি আইকনিক ব্র্যান্ড এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা প্রমাণ করে যে, বিশ্ব অর্থনীতির চাকা বদলে যাচ্ছে। বাইক প্রেমীরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছেন, বাজাজের নেতৃত্বে কেটিএম আগামীর দিনগুলোতে কোন নতুন চমক নিয়ে আসে। আরো জানতে ভিজিট করুন।