বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুবাতাস বইছে। দীর্ঘদিনের ডলার সংকট কাটিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরেছে। প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) অভাবনীয় সাফল্যের ওপর ভর করে ২ ফেব্রুয়ারি দিন শেষে গ্রস রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের কঠোর তদারকি ও অর্থপাচার রোধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো এই বড় অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
রিজার্ভের নতুন চমক: ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার, ফিরছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মেঘ কাটতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২ ফেব্রুয়ারি গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ীও এটি এখন ২৮ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। এই প্রবৃদ্ধি দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরণের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ডলারের বিশাল রেমিট্যান্স আসার ফলে ডলারের বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। ব্যাংকগুলোতে ডলারের উদ্বৃত্ত থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনতে শুরু করেছে। মূলত বৈদেশিক মুদ্রার যোগান ও চাহিদার ভারসাম্য ঠিক রাখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী আয়ের উল্লম্ফন ও ডলারের বাজারে স্বস্তি
নতুন বছরের শুরুতেই প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। জানুয়ারি মাসে ৩১৭ কোটি ডলার আসার ফলে দেশের ব্যাংকগুলোতে ডলারের তারল্য সংকট অনেকটাই কেটে গেছে। এই অতিরিক্ত ডলার বাজারে আসায় বিনিময় হার কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তবে রপ্তানি এবং প্রবাসী আয় যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে গত সোমবার ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতিতে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে কেনা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে মোট ৪১৫ কোটি ডলার কিনে রিজার্ভের ঝুলি বড় করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আরো পড়ুন:-বদলির আদেশ ছেঁড়া সেই এনবিআর কর্মকর্তার বরখাস্ত প্রত্যাহার
অতীতের সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
২০২২ সাল থেকে দেশের ডলার বাজার চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। এক সময় ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে লাফিয়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বাজারে ছেড়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত তিন অর্থবছরে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার অর্থপাচার বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। এতে হুন্ডি ব্যবসা কমে যাওয়ায় বৈধ পথে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়েছে। গত কয়েক অর্থবছরের তুলনায় এবার ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনার পরিমাণ অনেক বেশি। আগের বছরগুলোতে যেখানে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার কেনা সম্ভব হতো, সেখানে এবার তা কয়েকগুণ বেড়েছে।
কেন বাজার থেকে ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ডলারের সরবরাহ বাড়লে দাম কমলে তো মানুষের লাভ। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখানে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে। ডলারের দাম হঠাৎ অনেক বেশি কমে গেলে প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে আগ্রহ হারাবেন। একই সাথে রপ্তানিকারকরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যা দেশের বৈদেশিক আয়ের চাকা স্থবির করে দিতে পারে।
মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “বর্তমানে বাজারে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক বেশি। দাম যেন অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়, সেজন্য আমরা বাজার থেকে ডলার কিনে ভারসাম্য বজায় রাখছি। এর ফলে একদিকে যেমন বাজার স্থিতিশীল থাকছে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালীহচ্ছে।”
আরো পড়ুন:-বাণিজ্য মেলায় ৩৯৩ কোটির রেকর্ড বিক্রি: পর্দা নামল আসরের
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে বাংলাদেশ
রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানো কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ওপর বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক। বর্তমান সরকারের সংস্কারমুখী পদক্ষেপের ফলে রপ্তানি আয়ও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থপাচার রোধে কঠোর মনিটরিং থাকায় ডলারের অবৈধ বাজার এখন অনেকটাই কোণঠাসা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে। ব্যাংকগুলো এখন এলসি (LC) খুলতে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। আমদানিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে ডলারের নিশ্চয়তা পাওয়ায় দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহও স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন রক্ষকের ভূমিকা থেকে সংগ্রাহকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ডলার বিক্রি করে বাজার সামাল দেওয়ার দিন শেষ হয়ে এখন ডলার কিনে রিজার্ভ ভরার দিন শুরু হয়েছে। প্রবাসীদের দেশপ্রেম এবং সরকারের দক্ষ নীতি এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। আগামী দিনগুলোতে রিজার্ভের এই অবস্থান দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেবে। আরো জানতে ভিজিট করুন।