জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ততটাই বাড়ছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা এখন প্রকাশ্য সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন জেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং প্রাণহানির মতো ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখলেও মাঠপর্যায়ের সংঘাত থামছে না।
ভোটের মাঠে রক্তের ছাপ: বাড়ছে সহিংসতা ও জনআতঙ্ক, উত্তপ্ত নির্বাচনী ময়দান!
তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন থমথমে। জনসভা ও গণসংযোগের মতো সাধারণ কর্মসূচিগুলোও এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। প্রধান প্রধান দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ সংঘাত ঘটছে। মাঠের এই অস্থিতিশীলতা ভোটারদের মনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সারা দেশে সহিংসতার খণ্ডচিত্র
শেরপুরের শ্রীবরদীতে গত ২৮ জানুয়ারি নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। একই দিনে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী এলাকায়ও বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো প্রার্থীদের ওপর সরাসরি হামলা। গত ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর-২ আসনের প্রার্থী আলী নাছের খানকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো গোলযোগ নয়, বরং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের ওপর বড় ধরণের আঘাত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরো পড়ুন:-ঢাকা-১০ আসনে রবিউল বনাম জসীম: ভোটের লড়াইয়ে জিতবে কে?
পুলিশ সদরদপ্তরের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চারটি সরাসরি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এছাড়াও রয়েছে:
- প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ: ৫৫টি
- প্রার্থীর ওপর হামলা: ৬টি
- নির্বাচনী অফিসে আগুন ও হামলা: ৮টি
- প্রচারণায় বাধা: ১৭টি
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশের ২৫টি জেলা এবং ৩টি মহানগরে এই সহিংসতার বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর জেলাকে এখন ‘সহিংসতার হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
ঝুঁকিপূর্ণ জেলা ও ‘টার্গেট কিলিং’-এর আশঙ্কা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা জেলা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংঘাতপ্রবণ। চৌদ্দগ্রাম ও হোমনা এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বহরে হামলা এবং দলীয় অফিস ভাঙচুরের ঘটনা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্মীপুরেও চার দফায় বড় ধরণের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ভোটের দিন যত কাছে আসবে, ‘টার্গেট কিলিং’ বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঝুঁকি তত বাড়বে। নেত্রকোনায় ককটেল উদ্ধার এবং কক্সবাজারে প্রার্থীর বাসায় কাফনের কাপড় পাঠানোর মতো ঘটনাগুলো এই আশঙ্কাকে আরও দৃঢ় করছে।
আরো পড়ুন:-তারুণ্যনির্ভর এনসিপির ইশতেহার: থাকছে মোবাইল আইসিইউ চমক
অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া: বড় ঝুঁকি
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনও পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই অবৈধ অস্ত্রগুলোই এখন সহিংসতার মূল হাতিয়ার হয়ে উঠছে। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুকের মতে, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এই অস্ত্রগুলোর ব্যবহার বেড়ে যেতে পারে। এতে করে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও যৌথ অভিযান
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী যৌথ অভিযান চালাচ্ছে। আইএসপিআর-এর তথ্যমতে, গত ১১ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ১,৫০৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১৫৩টি অস্ত্র এবং ১,৮৩৪টি গোলাবারুদ।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনী মাঠে কাউকেই আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া হবে না। যারাই বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে তল্লাশি এবং গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে।
আরো পড়ুন:-আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পূর্বাভাস: কোন কোন জেলা ভিজবে?
ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত
পুলিশের সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরল হুদা মনে করেন, পরিস্থিতি এখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। তবে বড় ধরণের বিপর্যয় এড়াতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের গতি বাড়াতে হবে। সঠিক সময়ে আগাম খবর পাওয়া গেলে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
অন্যদিকে, সাধারণ ভোটাররা চাইছেন একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, যেখানে তারা নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। রাজনীতির এই রক্তক্ষয়ী খেলা যদি বন্ধ না হয়, তবে ভোটার উপস্থিতি কমার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। আরো জানতে ভিজিট করুন।