দীর্ঘ এক যুগের বিরতি ভেঙে আবারও সরাসরি আকাশপথে যুক্ত হলো ঢাকা ও করাচি। গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ডানা মেলেছে। এই ঐতিহাসিক যাত্রার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সরাসরি যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
ঢাকা থেকে করাচি সরাসরি ফ্লাইট: এক যুগ পর বিমানের ডানা মেলল পাকিস্তান
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি আকাশপথের যোগাযোগ দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বন্ধ ছিল। এতদিন এই দুই দেশের যাত্রীদের দুবাই, দোহা বা কলম্বো হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করতে হতো। তবে এখন থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কল্যাণে মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টাতেই ঢাকা থেকে করাচি পৌঁছানো সম্ভব হবে।
২৯ জানুয়ারি রাত ৮টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানের প্রথম ফ্লাইট বিজি-৩৪১ করাচির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে এই ফ্লাইটটি করাচি পৌঁছায় স্থানীয় সময় রাত ১১টায়। এক যুগ পর এই রুটে ফ্লাইট চালুর খবরটি ভ্রমণপিপাসু ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও উপস্থিত অতিথিরা
এই রুটের পুনর্জন্ম উপলক্ষ্যে ঢাকা বিমানবন্দরে একটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পর্ষদ চেয়ারম্যান শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রুটের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ইমরান হায়দার। তিনি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক এবং বিমানের এমডি ও সিইও ড. মো. সাফিকুর রহমানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
আরো পড়ুন:-৩টি টিকিট কিনলে ১টি ফ্রি! ফিটস এয়ারের বিশেষ অফার ঘোষণা
কেন এই রুটটি গুরুত্বপূর্ণ?
ঢাকা-করাচি রুটটি চালুর পেছনে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অনেক কারণ রয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতি বছর বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক লেনদেন হয়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল এবং সুতা আমদানির ক্ষেত্রে করাচি একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় ব্যবসায়ীরা নমুনা পাঠানো বা জরুরি মিটিংয়ের জন্য যাতায়াতে অনেক ভোগান্তির শিকার হতেন।
ব্যবসায়ী ছাড়াও অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা ও কারিগরি শিক্ষার জন্য অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থান করেন। সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ায় তাদের যাতায়াত খরচ যেমন কমবে, তেমনি সময়ও বাঁচবে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে ধর্মীয় পর্যটন ও পারিবারিক বন্ধন রক্ষায় এই ফ্লাইটটি একটি সেতু হিসেবে কাজ করবে।
বিমানের ফ্লাইট শিডিউল ও সময়সূচি
বিমানের বর্তমান শীতকালীন সূচি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে করাচি রুটে সপ্তাহে দুটি করে ফ্লাইট পরিচালিত হবে। প্রতি বৃহস্পতিবার ও শনিবার ঢাকা থেকে স্থানীয় সময় রাত ৮টায় ফ্লাইটটি ছেড়ে যাবে। আবার একই দিনে করাচি থেকে ফিরতি ফ্লাইট বিজি-৩৪২ স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে।
ফিরতি এই ফ্লাইটটি ঢাকা পৌঁছাবে ভোর ৪টা ২০ মিনিটে। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রীদের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে ফ্লাইটের সংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে। বিশেষ করে রমজান এবং ঈদের মৌসুমে যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে বিশেষ পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
আরো পড়ুন:-বিমান ভাড়া নিয়ন্ত্রণ: সরকারকে কড়া সতর্কবার্তা দিল আয়াটা
টিকিটের মূল্য ও সুযোগ-সুবিধা
ঢাকা-করাচি রুটে বিমানের টিকিটের দাম অন্যান্য বিদেশি এয়ারলাইন্সের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক রাখা হয়েছে। বর্তমানে ইকোনমি ক্লাসে যাওয়া-আসা মিলিয়ে টিকিটের দাম ৫৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এটি নির্ভর করছে টিকিট বুকিংয়ের সময় এবং সিট প্রাপ্যতার ওপর।
যাত্রীরা বিমানে ৩০ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত ব্যাগেজ সুবিধা পাবেন, যা প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। দীর্ঘ এক যুগ পর ফ্লাইট শুরু হওয়ায় বিমান বিশেষ অফারও দিচ্ছে। যাত্রীরা অনলাইন বা অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করতে পারছেন। বিমানের নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপ থেকেও টিকিট বুকিংয়ের সুবিধা রয়েছে।
পুরানো দিনের স্মৃতি ও দীর্ঘ অপেক্ষা
বিগত ২০১২-১৩ সালের দিকে ঢাকা-করাচি রুটে বিমানের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সরাসরি ফ্লাইট ছিল না। মাঝপথে কিছু বেসরকারি এয়ারলাইন্স চেষ্টা করলেও তা স্থায়ী হয়নি। ফলে যাত্রীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার সরাসরি ফ্লাইটের অপেক্ষায় ছিলেন।
বাংলাদেশ বিমান বর্তমানে তাদের বহর আধুনিকায়ন করছে। করাচি রুটে নতুন প্রজন্মের বোয়িং ৭৩৭ বা বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই বিমানগুলো যাত্রীদের এক আরামদায়ক যাত্রার অভিজ্ঞতা দেবে। প্রথম ফ্লাইটের যাত্রীরা জানিয়েছেন, সরাসরি যাতায়াত করতে পেরে তারা অত্যন্ত আনন্দিত।
আরো পড়ুন:-আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পূর্বাভাস: কোন কোন জেলা ভিজবে?
আঞ্চলিক বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত জরুরি। পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সরাসরি ফ্লাইট চালুর ফলে দুই দেশের পণ্য আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা একে অপরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন।
বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দলের যাতায়াত সহজ হওয়ায় দুই দেশের বিনিয়োগকারীরা নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে টেক্সটাইল, চামড়া ও কৃষি পণ্য আমদানিতে নতুন গতির সঞ্চার হবে। সরাসরি ফ্লাইটের কারণে লজিস্টিক খরচও আগের তুলনায় অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের সম্ভাবনা
করাচি পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান শহর এবং বড় একটি বন্দর নগরী। পর্যটনের দিক থেকেও শহরটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। অনেক বাংলাদেশি ভ্রমণপিপাসু পাকিস্তানের ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখতে আগ্রহী। সরাসরি ফ্লাইট চালুর ফলে পর্যটকরা এখন অনেক সহজে এবং কম খরচে পাকিস্তান ভ্রমণে যেতে পারবেন।
একইভাবে পাকিস্তানের অনেক নাগরিকও বাংলাদেশে ভ্রমণে আসতে আগ্রহী। বিশেষ করে সমুদ্র সৈকত এবং সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে তারা এখন সরাসরি ফ্লাইটে আসতে পারবেন। এর ফলে বাংলাদেশের পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ প্রশস্ত হবে।
আরো পড়ুন:-এনটিআরসিএ ৭ম বিশেষ নিয়োগের ফল প্রকাশ: সুপারিশ পেলেন ১১৭১৩ জন
আগামী দিনের পরিকল্পনা
বিমানের সিইও ড. মো. সাফিকুর রহমান জানিয়েছেন, করাচি রুটের পর বিমানের পরবর্তী লক্ষ্য হলো লাহোর এবং ইসলামাবাদের সাথেও সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা। বিমান কেবল যাত্রী পরিবহন নয়, বরং কার্গো পরিবহনের ওপরও জোর দিচ্ছে। সরাসরি ফ্লাইট চালুর ফলে পচনশীল পণ্য আদান-প্রদান আরও সহজ হবে।
বর্তমানে বিশ্বের অনেক বড় এয়ারলাইন্স যেমন এমিরেটস বা কাতার এয়ারওয়েজ এই রুটে কানেক্টিং ফ্লাইট পরিচালনা করে। তবে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট চালুর ফলে তারা বড় ধরণের প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। যাত্রীদের মানসম্মত সেবা দিতে পারলে বিমান এই রুটে দ্রুত লাভজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।
এক যুগ পর ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। এটি কেবল বিমানের আয় বাড়াবে না, বরং দুই দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে। সাশ্রয়ী ভাড়া, আধুনিক বিমান এবং সরাসরি যাতায়াতের সুবিধা—সব মিলিয়ে বিমান এই রুটে এক নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি সেবার মান উন্নত রাখাই এখন বিমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আরো জানতে ভিজিট করুন।