রাবিতে হট্টগোল: ১৬৫ ‘ফ্যাসিস্ট’ শিক্ষকের তালিকা নিয়ে তোলপাড় - Trend Bd

রাবিতে হট্টগোল: ১৬৫ ‘ফ্যাসিস্ট’ শিক্ষকের তালিকা নিয়ে তোলপাড়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) গণভোট-২০২৬ সংক্রান্ত এক সচেতনতামূলক সভায় নজিরবিহীন হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া শিক্ষকদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সভার পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, খোদ উপাচার্যকে মঞ্চে এসে আম্মারের বক্তব্য থামিয়ে দিতে হয়। সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত এই ঘটনায় ক্যাম্পাস জুড়ে এখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।

রাবিতে হট্টগোল: ১৬৫ ‘ফ্যাসিস্ট’ শিক্ষকের তালিকা নিয়ে তোলপাড়! তোপের মুখে উপাচার্য

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) যৌথভাবে সোমবার একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিল। আলোচনার মূল বিষয় ছিল ‘গণভোট-২০২৬’ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। সভা চলাকালীন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার উপস্থিত শিক্ষকদের একাংশকে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ বলে আখ্যা দেন। ১৬৫ জন শিক্ষকের একটি দীর্ঘ তালিকা তিনি প্রকাশ করার চেষ্টা করলে উপাচার্য তাতে বাধা দেন। এ নিয়ে শুরু হয় তুমুল হট্টগোল।

ঘটনার শুরুতেই সালাহউদ্দিন আম্মার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে কথা বলার সুযোগ চান। প্রথমে অনীহা দেখালেও পরে তাকে ফ্লোর দেওয়া হয়। আম্মার মাইক্রোফোন হাতে নিয়েই উপস্থিত কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষকের নাম উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, জুলাই বিপ্লবের সময় এসব শিক্ষক হয় নীরব ছিলেন, না হয় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নির্দেশদাতা হিসেবে নেপথ্যে কাজ করেছিলেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষত ও শিক্ষকদের ভূমিকা

সালাহউদ্দিন আম্মার তার বক্তব্যে বলেন, “রাজশাহীতে আন্দোলনের সময় আমরা সাধারণ মানুষকে কথা দিয়েছিলাম। যারা আমাদের ভাইদের রক্ত ঝরিয়েছে, যারা জুলাই গণহত্যায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল, তাদের বিচার আমরা করবই। আজ এই এলিট শ্রেণির ভেতর যারা ঘাতকদের হয়ে কাজ করেছিল, তারা এখানে বুক ফুলিয়ে বসে আছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের মতো একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার প্রচারণায় সেই সব শিক্ষকদের রাখা হয়েছে যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করেছিলেন। তার দাবি, পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি এবং বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ রাবির প্রভাবশালী অনেক শিক্ষক ওই সময় শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে গণভোটের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সালাহউদ্দিন আম্মারের সেই বিস্ফোরক তালিকা

বক্তব্য দেওয়ার সময় আম্মার হঠাৎ করেই তার কাছে থাকা একটি ফাইল থেকে নাম ঘোষণা শুরু করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর গোলাম সাব্বির সাত্তার, সাবেক প্রো-ভিসি সুলতানুল ইসলাম টিপু এবং জনসংযোগ দপ্তরের সাবেক প্রশাসক প্রফেসর প্রণব কুমার পাণ্ডের নাম উল্লেখ করেন। এছাড়া হিসাববিজ্ঞান বিভাগের হুমায়ুন কবির এবং গণিত বিভাগের আসাবুল হকসহ আরও অনেকের নাম প্রকাশ্যে আনেন।

আম্মার বলেন, “এখানে ১৬৫ জন শিক্ষকের নাম আছে। তারা কেবল জুলাই মাসেই নয়, গত ১৫ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে সহায়তা করেছেন। তাদের ফাইল আজ আমার হাতে।” তিনি যখন একে একে নামগুলো পড়ছিলেন, তখন সভাকক্ষে থাকা আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের মধ্যে চরম অস্বস্তি ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

আরো পড়ুন:-বাংলাদেশে আসছে নতুন রাজনৈতিক সরকার: আলী রীয়াজের হুংকার

উপাচার্যের বাধা ও মঞ্চের নাটকীয়তা

আম্মারের তালিকা পড়া শুরু করার কিছুক্ষণ পরই মঞ্চে থাকা উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব দাঁড়িয়ে পড়েন। তিনি আম্মারের কাছে গিয়ে তাকে বক্তব্য থামানোর অনুরোধ করেন। উপাচার্য বলেন, “তুমি পুরো তালিকা পড়ার সময় এখানে পাবে না। তোমার যা বলার তা বলা হয়ে গেছে। তুমি এই তালিকা আমাদের দিয়ে দাও, আমরা তা দেখব।”

উপাচার্যের এমন পদক্ষেপে ছাত্রনেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আম্মার উপাচার্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যারা শিক্ষার্থীদের খুনিদের সহায়তা করেছে, তাদের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হওয়া উচিত নয়। তবে উপাচার্যের অনড় অবস্থানের কারণে আম্মার তালিকা পড়া শেষ করতে পারেননি। পরে তিনি সভা বর্জন করে সিনেট ভবনের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।

গণভোট ২০২৬: কেন এই আয়োজন?

২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালে একটি গণভোটের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই গণভোটের মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থা, সংবিধানের পরিবর্তন এবং আগামীর পথরেখা নির্ধারিত হওয়ার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়ার জন্যই ইউজিসি এই সভার আয়োজন করে।

তবে শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসনের ভেতর থেকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা পুরোনো সরকারের মদতপুষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণ না করা হবে, ততক্ষণ গণভোটের প্রক্রিয়া শতভাগ স্বচ্ছ হবে না। রাবির এই হট্টগোল সেই অভ্যন্তরীণ ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, যারা রক্তের ওপর দিয়ে আসা পরিবর্তনের সুফল ভোগ করছেন, তারা যেন খুনিদের সাথে এক কাতারে না বসেন।

আরো পড়ুন:-আইইউবিএটিতে স্প্রিং ২০২৬ সেমিস্টারের জমকালো নবীনবরণ

ক্যাম্পাসে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের অবস্থান

বিগত ৫ই আগস্টের পর রাবির অনেক প্রভাবশালী শিক্ষক আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তারা আবারও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজেও তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। আম্মারের অভিযোগ, এই শিক্ষকরাই পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে প্রশাসনিক সংস্কারে বাধা দিচ্ছেন। তারা বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।

সোমবারের সভায় উপস্থিত শিক্ষকদের নাম ধরে ডাকার বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসে নানা গুঞ্জন চলছে। একাংশ মনে করছেন, সরাসরি নাম ধরে অভিযুক্ত করা শিষ্টাচার বহির্ভূত। অন্যদিকে, সিংহভাগ শিক্ষার্থী মনে করেন, সত্য বলতে কোনো ভয় নেই এবং ঘাতকদের বিচারের আগেই তাদের পুনর্বাসন করা অন্যায়।

পরবর্তী ঘোষণা: প্রেস ব্রিফিং ও নথিপত্র প্রকাশ

বক্তব্য থামিয়ে দেওয়ার পর সালাহউদ্দিন আম্মার ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি এই ঘটনার পর সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেখানে তিনি ১৬৫ জন শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণ সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেবেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র মাটিতে ফ্যাসিবাদীদের কোনো জায়গা হবে না। গণভোট হবে স্বচ্ছ মানুষের অংশগ্রহণে, খুনিদের দোসরদের দিয়ে নয়।”

সালাহউদ্দিন আম্মার আরও জানান, রেজিস্ট্রারের কাছে তারা বারবার তদন্তের দাবি জানালেও কোনো ফল আসেনি। তাই এখন থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই দুর্নীতির প্রমাণসহ এই অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন কেন এই শিক্ষকদের সুরক্ষা দিচ্ছে, সেই প্রশ্নও তিনি তোলেন।

আরো পড়ুন:-জবি ভর্তি শেষ: ২ ফেব্রুয়ারি ফল এবং ক্লাস শুরু ১৯ এপ্রিল

আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা নজরদারি

সিনেট ভবনের এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ছাত্র সংসদ ও শিক্ষকদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়াতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানান, গণতান্ত্রিক পরিবেশে দ্বিমত থাকতে পারে, তবে সভার কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটানো উচিত নয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা কেবল একটি সভার গোলযোগ নয়, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের পথে থাকা এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। ফ্যাসিবাদমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার যে আন্দোলন জুলাই মাসে শুরু হয়েছিল, তা যে এখনও শেষ হয়নি—রাবির সিনেট ভবনের হট্টগোল সেটিই মনে করিয়ে দেয়। উপাচার্যের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতি সামাল দিলেও শিক্ষার্থীদের মনে জমে থাকা ক্ষোভ আগামীর গণভোটের পরিবেশকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা এখন দেখার বিষয়। আরো জানতে ভিজিট করুন।

Leave a Comment