লাহোরে পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচটি নিছক একটি সাধারণ ম্যাচ হিসেবে শেষ হতে পারত। কিন্তু পাকিস্তানি উইকেটকিপার খাজা নাফাইয়ের একটি বিতর্কিত স্টাম্পিং পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আইসিসির নিয়ম স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করার পরও আম্পায়ারের দেওয়া সেই ‘আউট’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। ক্রিকেট বোদ্ধারা প্রশ্ন তুলছেন—প্রযুক্তির এই যুগেও এমন ভুল কীভাবে সম্ভব?
আইন ভেঙে আউট! পাকিস্তানি কিপারের আজব স্টাম্পিংয়ে তোলপাড় ক্রিকেট বিশ্ব
মাঠের লড়াইয়ে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু সেটি যখন তর্কের ঊর্ধ্বে থাকে না, তখন ক্রিকেটের আভিজাত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। লাহোরে অনুষ্ঠিত সিরিজের শেষ টি-টোয়েন্টিতে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। পাকিস্তানি বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ নওয়াজের বলে অজি ব্যাটার কুপার কনলি যখন স্টাম্পিং হলেন, তখন গ্যালারিতে উল্লাস চললেও টিভি রিপ্লেতে ধরা পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। উইকেটকিপার খাজা নাফাই এক হাতে বল ধরে অন্য হাতে স্টাম্পের বেল ফেলে দিয়েছেন। আইসিসির আইন অনুযায়ী যা কোনোভাবেই আউট হতে পারে না।
এই একটি উইকেট কেবল অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করেনি, বরং আম্পায়ারিংয়ের মান নিয়েও বড় ধরণের বিতর্ক তৈরি করেছে। ২০৮ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া তখন এমনিতেই ধুঁকছিল। ৮২ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর কনলির এই বিতর্কিত বিদায় তাদের ইনিংসের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। শেষ পর্যন্ত অজিরা ৯৬ রানে অলআউট হয়ে ১১১ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে হোয়াইটওয়াশ হয়।
কী ঘটেছিল সেই বিতর্কিত মুহূর্তে?
ঘটনাটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ১৪তম ওভারের। পাকিস্তানের অভিজ্ঞ স্পিনার মোহাম্মদ নওয়াজ তখন বল করছিলেন। ক্রিজে ছিলেন অজি তরুণ ব্যাটার কুপার কনলি। নওয়াজের একটি শর্ট লেন্থের বল লেগ সাইড দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কনলি ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে বড় শট খেলার চেষ্টা করেন, কিন্তু বলে ব্যাটের সংযোগ হয়নি।
বলটি সরাসরি কিপার খাজা নাফাইয়ের গ্লাভসে জমা হয়। কনলি তখন ক্রিজের অনেকটা বাইরে ছিলেন। নাফাই মুহূর্তের মধ্যে স্টাম্পের বেল ফেলে দেন এবং আউটের আবেদন জানান। অন-ফিল্ড আম্পায়ার খুব বেশি সময় না নিয়েই আঙুল তুলে দেন। কিন্তু স্লো মোশন ফুটেজে দেখা যায়, নাফাইয়ের ডান হাতে বল থাকলেও তিনি স্টাম্পের বেল ফেলেছেন তার খালি বাম হাত দিয়ে। ক্রিকেটের ব্যাকরণ অনুযায়ী, এটি একটি বড় ধরণের অসঙ্গতি।
আরো পড়ুন:-বিশ্বকাপে ভারত ম্যাচ বয়কট পাকিস্তানের! আইসিসির জরুরি সভা
আইসিসির আইন কী বলছে?
ক্রিকেট খেলার আইন প্রণয়নকারী সংস্থা এমসিসি এবং আইসিসির প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী, কোনো ব্যাটারকে স্টাম্প আউট বা রান আউট করতে হলে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মানতে হয়। আইসিসির ২৯.২.১ ধারায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, “উইকেট সঠিকভাবে ভেঙেছে বলে গণ্য হবে তখনই, যখন বেলটি স্টাম্পের ওপর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে অথবা ফিল্ডারের হাতে বল থাকা অবস্থায় সেই হাত দিয়ে আঘাত করে স্টাম্প উপড়ে ফেলা হবে।”
সহজ কথায়, যদি একজন ফিল্ডার বা কিপার তার হাত দিয়ে স্টাম্প ভাঙতে চান, তবে বলটি অবশ্যই সেই হাতের সংস্পর্শে থাকতে হবে। যদি বল এক হাতে থাকে এবং অন্য হাত দিয়ে স্টাম্প ভাঙা হয়, তবে সেটি কোনোভাবেই আউট হবে না। খাজা নাফাইয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। তার বল ছিল ডান হাতে, কিন্তু তিনি বেল ফেলেছেন বাম হাত দিয়ে। প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন থার্ড আম্পায়ার এটি পরীক্ষা করলেন না, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
আম্পায়ারের ভুল নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
আধুনিক ক্রিকেটে রান আউট বা স্টাম্পিংয়ের মতো সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত থার্ড আম্পায়ারের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে অন-ফিল্ড আম্পায়ার এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তিনি সরাসরি আউট দিয়ে দেন। মজার ব্যাপার হলো, কুপার কনলি নিজেও হয়তো বুঝতে পারেননি যে কিপার আইন ভেঙেছেন। ফলে তিনিও রিভিউ নেওয়ার বা প্রতিবাদ করার সুযোগ পাননি।
টিভি রিপ্লেতে বিষয়টি ধরা পড়ার পর ধারাভাষ্য কক্ষ থেকেও অবাক হওয়ার মতো মন্তব্য আসে। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের মতে, এটি আম্পায়ারের চরম গাফিলতি। যখন কিপারের দুই হাত আলাদা থাকে, তখন আম্পায়ারের উচিত ছিল বিষয়টি পুনরায় পরীক্ষা করা। এই ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
আরো পড়ুন:-ভারত-পাক মহারণ আজ: কে যাচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৯ সেমিফাইনালে?
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয় ও হোয়াইটওয়াশ
বিতর্কিত এই আউটের আগে থেকেই অস্ট্রেলিয়া বেশ চাপে ছিল। ২০৮ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তাদের টপ অর্ডার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ৮২ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ক্রিজে আসা কুপার কনলিই ছিলেন শেষ ভরসা। কিন্তু বিতর্কিতভাবে আউট হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার বাকি ব্যাটাররা আর দাঁড়াতে পারেননি।
পুরো সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হার অজিদের জন্য এক বিশাল লজ্জা। বিশেষ করে লাহোরের পাটা উইকেটে পাকিস্তানি বোলারদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি সফরকারীরা। পাকিস্তানের পেসার এবং স্পিনারদের সমন্বিত আক্রমণে অজি ব্যাটিং লাইনআপ দিশেহারা হয়ে পড়ে। তবে এই দাপুটে জয়ের আনন্দের মাঝেও খাজা নাফাইয়ের সেই স্টাম্পিংটি একটি কালো দাগ হিসেবে থেকে যাবে।
ক্রিকেট বিশ্বে সমালোচনার ঝড়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এই আউটের ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। নেটিজেনরা পাকিস্তানি কিপারের এই কাজকে ‘চাতুরি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অনেকে আবার রসিকতা করে বলছেন, নাফাই কি নতুন কোনো আইন আবিষ্কার করলেন? তবে সিরিয়াস ক্রিকেট ভক্তদের দাবি, আম্পায়ারদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
আইসিসির এলিট প্যানেলের আম্পায়াররা যখন মাঠে থাকেন, তখন এমন ভুল কোনোভাবেই কাম্য নয়। অনেকে ভারতের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির প্রসঙ্গও টেনেছেন। ধোনি তার ক্যারিয়ারে অসংখ্য দ্রুতগতির স্টাম্পিং করেছেন, কিন্তু তিনি সবসময় বল থাকা হাতটিকেই স্টাম্পে লাগাতেন। কিপিংয়ের প্রাথমিক শিক্ষাতেই এই নিয়মটি শেখানো হয়, যা নাফাইয়ের মতো তরুণ তুর্কি ভুলে গেছেন বলে মনে হচ্ছে।
আরো পড়ুন:-কোহলি-বুমরাহর রেকর্ড কি ভাঙবে ২০২৬ বিশ্বকাপে? জানুন বিস্তারিত
খাজা নাফাইয়ের পারফরম্যান্স ও দায়বদ্ধতা
খাজা নাফাই পাকিস্তানের উদীয়মান একজন ক্রিকেটার। কিপিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও তিনি যথেষ্ট প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু এমন একটি বিতর্কিত ঘটনার সাথে নাম জড়িয়ে যাওয়ায় তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। একজন প্রফেশনাল ক্রিকেটার হিসেবে আইসিসির নিয়মকানুন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা জরুরি।
যদিও মাঠের উত্তেজনা অনেক সময় অনেক কিছু ভুলিয়ে দেয়, তবুও ফেয়ার প্লে বা খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব বজায় রাখা ক্রিকেটের অন্যতম শর্ত। নাফাই কি ইচ্ছে করে এমনটি করেছেন নাকি ভুলবশত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে দিনশেষে এটি ছিল একটি ভুল ডিসমিসাল, যা ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ে থেকে যাবে।
লাহোরের এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগেও মানবিক ভুল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আইসিসির ২৯.২.১ ধারাটি কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে আম্পায়ারদের প্রশিক্ষণে আরও জোর দেওয়া উচিত। অন্যদিকে, পাকিস্তান দলের জন্য এই হোয়াইটওয়াশ জয় বড় অর্জন হলেও, জয়ের ধরণটি যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেদিকে নজর রাখা জরুরি। ক্রিকেট প্রেমীরা আশা করেন, ভবিষ্যতে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে এবং ক্রিকেটের ‘স্পিরিট’ রক্ষা করা হবে। আরো জানতে ভিজিট করুন।