জিপি এবার বড় ছক্কা হাঁকাল। গ্রামীণফোন প্রথমবারের মতো ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম বরাদ্দের ডিমান্ড নোট হাতে পেয়েছে যা পুরো টেলিকম বাজারের চিত্র বদলে দেবে। বিটিআরসি এই সবুজ সংকেত দিয়েছে। ১৩ বছরের জন্য ১০ মেগাহার্জের এই চুক্তি গ্রাহকদের নেটওয়ার্ক অভিজ্ঞতায় বিশাল এক বিপ্লব ঘটাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
লিফটেও ফুল নেটওয়ার্ক? ২ হাজার কোটির বাজি ধরে জিপির নতুন চমক!
খেলার মাঠ যেমন প্রস্তুত। গ্রামীণফোন এবার ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নিয়ে এমন এক গেমে নেমেছে যেখানে গ্রাহকরাই হবে আসল উইনার। সোমবার এই সুখবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসি এই বরাদ্দপত্র দেওয়ার মাধ্যমে জিপির ঝুলিতে নতুন শক্তির জোগান দিয়েছে। ১৩ বছরের জন্য এই ১০ মেগাহার্জ স্পেকট্রাম এখন জিপির হাতে।
টাকা কিন্তু কম নয়। এই বিশাল ডিলের জন্য গ্রামীণফোনকে আগামী ১৩ বছরে জাতীয় রাজস্ব খাতে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঢালতে হবে। এটি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান। শুধুমাত্র টাকা দেওয়াই শেষ কথা নয় বরং এই ব্যান্ড ব্যবহার করে নেটওয়ার্ক ছড়াতে তারা আরও বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ছক কষছে। জিপি যেন এবার মাঝমাঠ থেকে একাই বল নিয়ে গোলপোস্টের দিকে এগোচ্ছে।
আরো পড়ুন:- নরসিংদীতে সাংবাদিকদের বাসে সন্ত্রাসী হামলা: জিম্মি নারী ও শিশুরা!
কেন এই ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ড এতো স্পেশাল?
ব্যপারটা একটু টেকনিক্যাল। কিন্তু সহজ করে বললে এই লো-ব্যান্ড স্পেকট্রাম হলো ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এমন এক স্ট্রাইকার যে ডিফেন্স ভেঙে গোল দিতে ওস্তাদ। এই ব্যান্ডের সিগন্যাল অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ফলে একটা টাওয়ার বা বেস স্টেশন দিয়েই বিশাল এক এলাকায় শক্তিশালী কভারেজ দেওয়া এখন পানির মতো সহজ হবে। এতে করে গ্রাম বা শহরের প্রতিটি কোণায় ইন্টারনেটের গতি পৌঁছাবে রকেটের মতো।
সমস্যাটা ইনডোরেই বেশি হয়। আমরা জানি উঁচু বিল্ডিং, শপিং মল কিংবা লিফটে ঢুকলে ফোনের নেটওয়ার্কের বারগুলো কেমন যেন উধাও হয়ে যেতে শুরু করে। এই ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ড মূলত দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢোকার ক্ষমতা রাখে। গ্রাহকরা এখন বেসমেন্ট কিংবা লিফটের ভেতরে দাঁড়িয়েও কথা বলতে পারবেন একদম নির্ভুলভাবে। কল ড্রপ হওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির এক জাদুকরী সমাধান হতে যাচ্ছে এই নতুন ব্যান্ড।
২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ
বিনিয়োগ মানেই বড় আশা। গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান এই স্পেকট্রাম বরাদ্দ নিয়ে তার উচ্ছ্বাস একদমই লুকিয়ে রাখেননি গণমাধ্যমের সামনে। তিনি জানিয়েছেন যে তারা এই খাতে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি বিশাল অঙ্কের বাজি ধরছেন। এই বিপুল অর্থ আমাদের দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে আরও শক্ত ভিত্তি দেবে। গ্রাহকদের প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য জিপি যে কতটা সিরিয়াস, এটি তারই এক জ্যান্ত প্রমাণ।
পরিকল্পনাটা বেশ লম্বা। ইয়াসির আজমান আরও জানিয়েছেন যে আগামীতে এই ব্যান্ড দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে তারা আরও বড় ইনভেস্টমেন্টের জন্য মানসিকভাবে সম্পূর্ণ তৈরি। এটি কোনো সাময়িক সমাধান নয় বরং এটি হলো গ্রাহকদের জন্য করা এক দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার। ভালো ইন্টারনেটের জন্য যেমন ভালো স্পেকট্রাম লাগে, জিপি ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে এই বিনিয়োগ যেন এক টনিকের মতো কাজ করবে।
আরো পড়ুন:- গাজীপুরে পপুলার ফার্মায় বিশাল নিয়োগ, আবেদন করুন ঘরে বসেই।
ফোরজি থেকে ফাইভজি: ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
টার্গেট এবার নেক্সট লেভেলে। এই লো-ব্যান্ড স্পেকট্রাম বর্তমানে থাকা ফোরজি সেবাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং গ্রাহকদের বাফারিং মুক্ত স্ট্রিমিং নিশ্চিত করবে। তবে জিপির নজর এখন আরও দূরের গোলপোস্টে অর্থাৎ ফাইভজি ইন্টারনেটের দিকে। এই ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ড ফাইভজি চালুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ হিসেবে কাজ করবে। ফিউচারিস্টিক সব প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে জিপি এখন কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে।
প্রযুক্তি এখন হাতের মুঠোয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এর মতো জটিল বিষয়গুলো এখন আর শুধু মুভির গল্প হয়ে থাকবে না। লো ল্যাটেন্সি বা কম সময়ের মধ্যে ডেটা আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে এই ব্যান্ড হবে সেরা অস্ত্র। দ্রুত গতির ইন্টারনেটের সাথে সাথে ভবিষ্যতের স্মার্ট ডিভাইসের মধ্যে সংযোগ স্থাপন হবে অনেক বেশি মসৃণ। জিপি যেন একাই পুরো দলকে ফাইভজির ফাইনালে নিয়ে যেতে চাইছে।
রাজস্ব খাতে বড় অবদান ও কর্মসংস্থান
সরকারের পকেটও ভারি হবে। ১৩ বছরে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা জমা দেওয়া মানে হলো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে পরোক্ষভাবে অংশ নেওয়া। এই টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামো খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। গ্রামীণফোন তাদের এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রমাণ করল যে তারা শুধু ব্যবসাই করে না বরং দেশের উন্নয়নেও সমান অংশীদার। জাতীয় রাজস্বের এই বড় জোগান দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কাজের সুযোগ বাড়ছে। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের এই বিশাল যজ্ঞে অনেক কারিগরি ও অকারিগরি জনবলের প্রয়োজন হবে দেশজুড়ে। নতুন টাওয়ার বসানো বা অপটিক্যাল ফাইবার বিছানোর কাজে বহু মানুষের রুটিরুজির ব্যবস্থা হবে। ডিজিটাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এরকম বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এটি কেবল এক কোম্পানির জয় নয় বরং এটি পুরো দেশের টেলিকম ইন্ডাস্ট্রির এক বড় জয়।
আরো পড়ুন:- পর্তুগালের পোর্তো বিজনেস স্কুলে ভর্তির ‘গোল’ দিতে এলো ট্রাভেলারকি
গ্রাহকদের জন্য এক নতুন যুগের শুরু
ভোগান্তি কি আর থাকবে? জিপির এই নতুন উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষ এখন থেকে নেটওয়ার্ক সংকটের দোহাই দিয়ে আর বসে থাকবে না। আপনি হসপিটালের বেসমেন্টে থাকুন বা লিফটে থাকুন, আপনার প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবে না। আধুনিক যুগের ডিজিটাল লাইফস্টাইলে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এখন বিলাসের চেয়ে বেশি প্রয়োজনের নাম। গ্রামীণফোন সেই চাহিদাকেই সম্মান দিয়ে এই বিশাল রিস্ক নিয়ে মাঠে নেমেছে।
অপেক্ষা এবার ফলের জন্য। স্পেকট্রাম পাওয়ার পর কাজ শুরু হবে এবং ধাপে ধাপে গ্রাহকরা এর সুফল পেতে শুরু করবেন। জিপির এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ অন্য অপারেটরদেরও প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করবে। যার চূড়ান্ত সুফল ভোগ করবে আমাদের দেশের কোটি কোটি মোবাইল গ্রাহক। খেলা কেবল শুরু হলো, এখন দেখার বিষয় এই ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের সাহায্যে জিপি কতগুলো বড় গোল দিতে পারে। আরো জানতে ভিজিট করুন।