শীতের হিমেল হাওয়া বাইকারদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি বাইকের ইঞ্জিনের জন্য কিছুটা যন্ত্রণারও। আপনি কি খেয়াল করেছেন, শীতের সকালে বাইক স্টার্ট দিতে গেলে আজকাল একটু বেশিই কসরত করতে হচ্ছে? এই সমস্যার মূলে রয়েছে আপনার বাইকের রক্ত—অর্থাৎ ইঞ্জিন অয়েল। সঠিক গ্রেডের তেল নির্বাচন না করলে আপনার শখের বাইকটি অকালেই বড় কোনো বিপদে পড়তে পারে। এই শীতে আপনার বাইকের ইঞ্জিনকে সতেজ রাখতে কোন গ্রেডের তেল সেরা হবে, তা নিয়ে আজকের এই বিস্তারিত আড্ডা।
ইঞ্জিন অয়েল আসলে কী? সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে, এটি ইঞ্জিনের ভেতরের পার্টসগুলোর ঘর্ষণ কমিয়ে সেগুলোকে মসৃণভাবে চলতে সাহায্য করে। কিন্তু শীত এলে এই তেলের ঘনত্ব বেড়ে যায়, অনেকটা ফ্রিজে রাখা তেলের মতো। যখন তেল ঘন হয়ে যায়, তখন এটি ইঞ্জিনের সব জায়গায় দ্রুত পৌঁছাতে পারে না। ফলে স্টার্ট দেওয়ার মুহূর্তে ইঞ্জিনের ভেতরের যন্ত্রাংশগুলো শুকনো অবস্থায় একে অপরের সাথে ঘষা খায়। এতে ইঞ্জিনের আয়ু কমে যায় এবং পারফরম্যান্স তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
ইঞ্জিন অয়েলের বোতলের গায়ে লেখা রহস্যময় সংখ্যাগুলো কি কখনও খেয়াল করেছেন? ’10W-30′ বা ’20W-40’—এই সাংকেতিক চিহ্নগুলোই আপনার বাইকের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। এখানে ‘W’ অক্ষরটি দিয়ে বোঝানো হয় ‘Winter’ বা শীতকাল। এই ‘W’-এর আগের সংখ্যাটি যত কম হবে, তেল তত বেশি পাতলা থাকবে এবং ঠান্ডায় দ্রুত প্রবাহিত হবে। তাই শীতের দেশে ৫ বা ১০ সংখ্যাযুক্ত তেলগুলোই বেশি জনপ্রিয় হয়ে থাকে।
অন্যদিকে ‘W’-এর পরের সংখ্যাটি আপনার বাইকের সহ্যক্ষমতা বোঝায়। ধরুন, লেখা আছে ‘40’ বা ‘50’, এর মানে হলো ইঞ্জিন যখন তুঙ্গে গরম হবে, তখন তেল কতটা ঘনত্ব ধরে রাখবে। বাংলাদেশের আবহাওয়া যেহেতু খুব একটা হিমাঙ্কের নিচে নামে না, তাই আমাদের এখানে ৩০ বা ৪০ বেশ ভালো কাজ করে। তবে শীতের কনকনে সকালে স্টার্টের সমস্যা এড়াতে ‘W’-এর আগের সংখ্যাটি ছোট হওয়া জরুরি। এই ছোট একটি পরিবর্তন আপনার জ্বালানি খরচও অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে।
বাংলাদেশের শীতে ১০ডব্লিউ-৩০ (10W-30) গ্রেডটিকে বিশেষজ্ঞরা দশে দশ দিচ্ছেন। এটি পাতলা হওয়ার কারণে স্টার্ট দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইঞ্জিনের মাথায় পৌঁছে যায়। আপনার বাইক যদি একটু পুরনো হয়, তবে ১০ডব্লিউ-৪০ ব্যবহার করাটাও বেশ বুদ্ধিমানের কাজ হবে। খুব বেশি ঘন তেল, যেমন ২০ডব্লিউ-৫০, শীতে ব্যবহার করলে আপনার বাইকের ব্যাটারির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। শীতের সকালে সেলফ স্টার্ট দিতে গিয়ে খিটখিট শব্দ হওয়ার এটিই প্রধান কারণ।
সংশ্লেষিত বা সিন্থেটিক ইঞ্জিন অয়েল এই সময়ে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। মিনারেল অয়েলের তুলনায় সিন্থেটিক অয়েল ঠান্ডায় জমে যায় না এবং উচ্চ তাপমাত্রাতেও নিজের গুণাগুণ হারায় না। দাম একটু বেশি হলেও, ইঞ্জিনের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার কথা ভাবলে এটিই সেরা বিনিয়োগ। আপনি যদি প্রতিদিন ভোরে বাইক নিয়ে বের হন, তবে সিন্থেটিক অয়েল ব্যবহার করা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক। এতে বাইকের শব্দ যেমন মসৃণ থাকবে, তেমনি স্মুথ রাইডিংয়ের মজাও পাবেন।
টাকায় টান পড়লেও তেলের মানের সাথে কখনও আপস করা উচিত নয়। একটি ভালো ব্র্যান্ডের ইঞ্জিন অয়েল আপনার বাইকের হার্টকে অনেক বছর সচল রাখবে। বাজারে অনেক নকল তেল থাকে, তাই বিশ্বস্ত ডিলার বা শোরুম থেকে তেল কেনা সবচেয়ে নিরাপদ। মনে রাখবেন, সস্তা তেলের কারণে ইঞ্জিনের পিস্টন বা সিলিন্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হলে আপনার পকেট থেকে হাজার হাজার টাকা বেরিয়ে যাবে। তাই সময়মতো ড্রেন দেওয়া এবং সঠিক গ্রেড বেছে নেওয়াই হবে একজন প্রকৃত রাইডারের কাজ।
আরো পড়ুন:-কেটিএমের শতভাগ মালিকানা নিলো বাজাজ: কাঁপছে বাইক দুনিয়া!
শীতে বাইকের বাড়তি সুরক্ষায় কিছু জরুরি টিপস
সকালে বাইক স্টার্ট দিয়েই সাথে সাথে পিকআপ বা থ্রটল দেবেন না। অন্তত ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড আইডল অবস্থায় ইঞ্জিন চালু রাখুন। এতে ইঞ্জিন অয়েল সার্কুলেশন হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়। যখন তেল পুরোপুরি ইঞ্জিনে ছড়িয়ে পড়ে, তখন রাইড শুরু করলে ইঞ্জিনের ওপর চাপ একদমই পড়ে না। এটি খুব সাধারণ একটি অভ্যাস হলেও ইঞ্জিনের আয়ু বাড়াতে জাদুর মতো কাজ করে।
চেইন লুব্রিকেশন করা এই সময়ে আরও বেশি দরকারি হয়ে পড়ে। শীতের কুয়াশা ও ধুলোবালিতে বাইকের চেইন খুব দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং জং ধরতে শুরু করে। অন্তত প্রতি ৫০০ কিলোমিটার পর পর ভালো মানের চেইন লুব ব্যবহার করুন। চেইন টাইট বা ঢিলে থাকলে তা রাইডিং অভিজ্ঞতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিষ্কার ও লুব্রিকেটেড চেইন থাকলে বাইক অনেক বেশি স্মুথ মনে হয়।
টায়ার প্রেশারের দিকেও নজর দেওয়া খুব জরুরি এই সময়। ঠান্ডায় বাতাসের ঘনত্ব কমে যায়, ফলে টায়ারের প্রেশারও স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যেতে পারে। টায়ারে বাতাস কম থাকলে ইঞ্জিনের ওপর বাড়তি লোড পড়ে এবং মাইলেজ কমে যায়। সপ্তাহে অন্তত একবার প্রেশার চেক করে ম্যানুফ্যাকচারারদের দেওয়া সঠিক মাপে বাতাস রাখুন। এতে কর্নারিং করার সময় যেমন আত্মবিশ্বাস পাবেন, তেমনি দুর্ঘটনা থেকেও বেঁচে থাকবেন।
আরো পড়ুন:-ইয়ামাহা এক্সএসআর ১৫৫ লঞ্চ হলো: জানুন দাম ও ফিচার
ব্রেক এবং ক্লাচ ক্যাবলগুলো পরীক্ষা করতে ভুলবেন না যেন। শীতে অনেক সময় ক্যাবলের ভেতর পানি জমে বা জং ধরে এগুলো শক্ত হয়ে যায়। একটু গ্রিজ বা লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করলে এগুলো মাখনের মতো কাজ করবে। আপনি যদি লং ট্যুরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে পুরো বাইকটি একবার চেকআপ করিয়ে নেওয়া ভালো। নিজের নিরাপত্তা এবং বাইকের সুস্থতা—দুটোই আপনার হাতের ওপর নির্ভর করে।
সবশেষে বলা যায়, শীত কেবল রাইডিংয়ের সময় নয়, এটি বাইকের প্রতি ভালোবাসা দেখানোরও সময়। সঠিক গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল আর সামান্য যত্ন আপনার পথচলাকে করবে আরও নিরাপদ ও আনন্দময়। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বা পাহাড়ের বাঁকে আপনার বাইকটি যেন কখনো আপনাকে মাঝপথে থামিয়ে না দেয়। সঠিক তথ্য জানুন, সচেতন থাকুন এবং বুক চিরে বেরিয়ে পড়ুন অজানার উদ্দেশ্যে। শুভ রাইডিং! আরো জানতে ভিজিট করুন।