পবিপ্রবিতে জটিলতার অবসান: হাইকোর্টের রায়ে প্রাণ ফিরে পেল পশুপালন ও পশুচিকিৎসা বিভাগ!
অবশেষে স্বস্তি ফিরল পটুয়াখালীতে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার মেঘ এক নিমেষেই কেটে গেল হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে। আদালত জানিয়ে দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পশুপালন (অ্যানিমেল হাজব্যান্ড্রি) এবং পশুচিকিৎসা (ভেটেরিনারি) দুটি কোর্সই আলাদাভাবে এবং সমান্তরালভাবে চলবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীরা এখন তাদের পছন্দমতো ও সোর্স অনুযায়ী ডিগ্রি সম্পন্ন করার আইনি অধিকার ফিরে পেলেন।
দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের এক অনন্য বিজয়
আদালতের বারান্দায় অপেক্ষার প্রহর শেষ। গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায়টি ঘোষণা করেন। রিটের পক্ষে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল সাহসিকতার সাথে আইনি লড়াই চালিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করেন। জয় হয়েছে ন্যায়ের, জয় হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেধার। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ কারো নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হঠকারী সিদ্ধান্তে জীবন থমকে গিয়েছিল অনেকের। পশুপালন এবং পশুচিকিৎসা—এই দুটি বিষয়ই কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য স্তম্ভ। ২০১১ সাল থেকে ইউজিসির অনুমোদনেই এই দুটি আলাদা ডিগ্রি পবিপ্রবিতে সফলভাবে প্রদান করা হচ্ছিল। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে হঠাৎ করেই পশুপালন ডিগ্রির অনুমোদন বাতিল করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছিল। এটি ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির পেশাগত আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।
কেন এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল?
ঘটনার মূলে ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন উপাচার্য হিসেবে একজন ভেটেরিনারি ডিগ্রিধারী শিক্ষক যোগদান করলে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। তিনি এসেই বিদ্যমান দুটি আলাদা কোর্স বাতিল করে বিতর্কিত ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’ চালুর ঘোষণা দেন। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ক্যারিয়ারের মাঝপথে এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ অন্ধকার ডেকে আনছিল।
শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন এভাবে ভেঙে যেতে পারে না। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সচেতন অভিভাবক এবং পশুপালন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। তারা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন এবং আইনি লড়াই শুরু করেন। তাদের দাবি ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক—যে নিয়মে তারা ভর্তি হয়েছেন, সেই নিয়মেই শিক্ষা কার্যক্রম চলতে হবে। শিক্ষার মতো পবিত্র একটি জায়গায় কোনো পেশাগত দ্বান্দ্বিকতার ছায়া থাকা উচিত নয়।
আরো পড়ুন:-আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন: আপিল বিভাগের আদেশ
আদালত কী রায় দিলেন?
আদালতের রায়টি ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। হাইকোর্ট আগের সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়ে পশুপালন, পশুচিকিৎসা এবং কম্বাইন্ড ডিগ্রি—তিনটিই চলমান রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে যারা বর্তমানে যে কোর্সে অধ্যয়ন করছেন, তাদের সেই ডিগ্রি পেতে আর কোনো বাধা রইল না। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই রায়ের ফলে পবিপ্রবিতে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ আবার ফিরে আসবে। এটি শুধু একটি রায় নয়, এটি হাজারো শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার রক্ষা কবচ।
এখন থেকে শিক্ষার্থীরা বাধাহীনভাবে পড়াশোনা করবেন। পশুপালন ও পশুচিকিৎসা দুটি ভিন্ন ক্ষেত্র হলেও একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। পশুপালন যেখানে প্রাণীর উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে, সেখানে পশুচিকিৎসা সরাসরি রোগ নিরাময়ে ভূমিকা রাখে। এই দুটি বিষয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে মূলত দেশের ডেইরি ও পোল্ট্রি খাতের ক্ষতি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আদালতের রায়ে সেই ষড়যন্ত্র এখন নস্যাৎ হয়ে গেল।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও আমাদের প্রত্যাশা
ক্যাম্পাসে এখন বইছে আনন্দের জোয়ার। পবিপ্রবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এই রায় তাদের জন্য এক নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে এসেছে। তারা এখন ল্যাবরেটরি আর ক্লাসরুমে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দেশের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করতে পারবেন। প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আবার গবেষণায় মন দেবে এটাই সবার কাম্য। আমাদের তরুণরা দক্ষ হয়ে উঠলেই দেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির দিকে।
তবে সতর্ক থাকতে হবে সর্বদা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেন আর কখনো সংকীর্ণ পেশাগত স্বার্থ জেঁকে বসতে না পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত একাডেমিক ক্যালেন্ডার গুছিয়ে নেওয়া। আমরা চাই না আর কোনো শিক্ষার্থীর চোখের জল আদালতের বারান্দায় পড়ুক। শিক্ষা হোক উন্মুক্ত, বৈষম্যহীন এবং সবার জন্য সমান সুযোগের আধার। আরো জানতে ভিজিট করুন।