অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হচ্ছে না। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর ধরে বুক ফেটে কান্না করা দুই মায়ের আর্তনাদ কি পৌঁছাবে গুম কমিশনের কানে? ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস গুম হওয়ার খবরটি এখন আবার উত্তাল করে তুলেছে ক্যাম্পাস। বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী যখন স্লোগান দিচ্ছিল, তখন আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। এই দীর্ঘ সময়ে পরিবারগুলো কেবল দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, কিন্তু তাদের প্রিয়জনদের ছায়াটুকুও আর স্পর্শ করতে পারেনি কেউ।
সাভারের সেই অভিশপ্ত রাত: যেভাবে হারিয়ে গেলেন দুই মেধাবী
২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতটা ছিল বিভীষিকার। দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ওয়ালিউল্লাহ এবং আল-ফিকহ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের আল মুকাদ্দাস কল্যাণপুর থেকে বাসে উঠেছিলেন। বাসটি সাভারের নবীনগর পৌঁছাতেই হঠাৎ গতিরোধ করা হয়। রাত তখন ১২টার মতো বাজে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৮-১০ জন লোক বাসে উঠে তাদের জোর করে নামিয়ে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তারা এক অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে গেছেন, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর কেটে গেছে ৫১১৩টি দিন। মুকাদ্দাসের চাচা আবদুল হাই এবং ওয়ালীউল্লাহর বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ থানায় জিডি করেছিলেন, দৌড়েছিলেন হাইকোর্ট পর্যন্ত। কিন্তু ফল মেলেনি কোনো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘পরিচয়’ দিয়ে তুলে নেওয়ার পর কোনো সংস্থাই তাদের আটকের কথা স্বীকার করেনি। এটি কি স্রেফ নিখোঁজ হওয়া, নাকি সুপরিকল্পিত কোনো গুম? পরিবারগুলোর এই প্রশ্নটি আজ ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
ইবি ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের ঝড়: ‘আমার ভাই ফিরবে কবে?’
ক্যাম্পাসের ফটক আজ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল। ‘অলি ভাই ফিরবে কবে, গুম কমিশন জবাব দে’—এই স্লোগানে কেঁপে উঠেছে কুষ্টিয়ার রাজপথ। শিক্ষার্থীরা আজ বিচার চায়। তাদের দাবি খুব স্পষ্ট, তারা জানতে চায় তাদের বড় ভাইয়েরা কি বেঁচে আছেন নাকি চিরতরে হারিয়ে গেছেন? ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর যখন অনেকের ফিরে আসার খবর আসছিল, তখন ইবিয়ানরা আশা করেছিল মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহও ফিরে আসবে। কিন্তু সেই আশার প্রদীপ এখনও জ্বলছে না।
মানববন্ধনে আবেগ ছিল বাঁধভাঙা। শিক্ষার্থীরা দাবি তুলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন দ্রুত এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর হদিস বের করে দেয়। তারা বলছেন, শহীদের লাশ পাওয়া যায়, কিন্তু গুম হওয়া মানুষের কবরেরও ঠিকানা থাকে না। এটি একটি জাতির জন্য চরম লজ্জার বিষয়। যারা এই অপহরণের সাথে জড়িত ছিল, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই গুমের সংস্কৃতি দেশ থেকে কোনোদিনই মুছে যাবে না।
আরো পড়ুন:-শিক্ষা অফিসে ডিজিটাল বিপ্লব: ট্রেনিং কলেজে হচ্ছে স্মার্ট ল্যাব
সাবেক প্রশাসনের ভূমিকা ও শিক্ষার্থীদের আল্টিমেটাম
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন এতদিন চুপ ছিল? শিক্ষার্থীদের মতে, তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই অনেক গোপন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। রাশেদুল ইসলাম রাফি নামে এক শিক্ষার্থী হুশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি আমাদের ভাইদের সন্ধান দিতে আপনারা ব্যর্থ হন, তবে ছাত্রসমাজ আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তারা মনে করেন, গুম হওয়া মানে কেবল দুই ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং একটি আদর্শকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা।
বিচারের দাবি এখন তুঙ্গে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, গত ১৭ বছরে যারা গুম ও খুনের সংস্কৃতি চালু করেছিল, তাদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই গুমের সাহস জোগায়। ইন্টারিম সরকারের কাছে তাদের অনুরোধ, যেন এই গুম হওয়া সন্তানদের ফিরিয়ে দিয়ে মায়েদের কোল ভরিয়ে দেওয়া হয়। যদি তারা না ফিরে আসে, তবে এই আন্দোলনের আগুন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে মনে করছেন ছাত্রনেতারা।
আরো পড়ুন:-মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সুখবর! উপবৃত্তির নিয়মে বিরাট পরিবর্তন
গুম হওয়া সন্তানদের মায়ের দীর্ঘশ্বাস কি থামবে?
ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাস কেবল নাম নয়। তারা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একটি স্বপ্ন ছিলেন, যারা আজ কেবল সাদা-কালো ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে আছেন। চৌদ্দ বছর একটি দীর্ঘ সময়। একটা মানুষ কতদিন নিখোঁজ থাকলে তাকে মৃত ধরা হয়, সেই হিসাব কষতে কষতে আজ ক্লান্ত তাদের স্বজনরা। তাদের পরিবার এখনও দরজায় কান পেতে থাকে, যদি কোনোদিন সেই পরিচিত ডাকটি আবার শুনতে পায়। কিন্তু দিন শেষে কেবল নিস্তব্ধতাই ফিরে আসে।
গুম কমিশনের ওপর সবার অনেক প্রত্যাশা। মানুষ চায় স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালাগুলোর রহস্য উদঘাটন করা হোক। সত্য বেরিয়ে আসুক দ্রুত। আমাদের দেশের ছাত্রসমাজ আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমেছে এই সত্যের সন্ধানে। তারা চায় না আর কোনো মা তার সন্তানের জন্য বছরের পর বছর জায়নামাজে বসে চোখের জল ফেলুক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়া এখন কেবল দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি অধিকার।
চৌদ্দ বছরের এই শূন্যতা কাটানো সহজ নয়। তবে শিক্ষার্থীদের এই মানববন্ধন আজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ভাইদের ভুলে যায়নি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আমরাও চাই ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাস ফিরে আসুক তাদের ক্যাম্পাসে। তাদের হাসি আবার মুখরিত করুক ইবির সবুজ প্রান্তর। এই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পুরো বাংলাদেশ, যেন আর কোনো মানুষ গুমের কালো ছায়ায় হারিয়ে না যায়। আরো জানত কিজিট করুন।