২৩ হাজার কোটির ক্ষত! ২০ বছরে ৯ ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড উপকূল, আমাদের কি তবে হার মানতে হবে?
উপকূল এখন মৃত্যুপুরী। গত ২০ বছর ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলাগুলো যেন প্রকৃতির সাথে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ‘সিডর’ থেকে শুরু করে ‘রেমাল’—একের পর এক আঘাত হানা নয়টি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আমাদের সাজানো সংসারগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, এই দীর্ঘ সময়ে কেবল আর্থিক ক্ষতির পরিমাণই দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের ভিটেমাটি হারানোর এক দীর্ঘশ্বাসের নাম।
ক্ষতের গভীরতা অনেক বেশি। শুধু টাকার অঙ্কে কি আসলে উপকূলের কান্না মাপা সম্ভব যেখানে ভিটেমাটি হারিয়ে মানুষ আজ উদ্বাস্তু? ঘূর্ণিঝড়ের পর লবণাক্ত পানি ঢুকে আবাদি জমিগুলো এখন মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। খুলনার দাকোপ কিংবা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মানুষের চোখে তাকালে কেবল শূন্যতা আর হাহাকার চোখে পড়ে। তাদের সাজানো গোছানো জীবনটা আজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে খুব দ্রুতগতিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই নিষ্ঠুর খেলায় আমরা যেন বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছি।
সিডর থেকে রেমাল: ধ্বংসের এক মহাকাব্য
সিডর ছিল এক মহাপ্রলয়। ২০০৭ সালের সেই ঘূর্ণিঝড় একাই কেড়ে নিয়েছিল ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার সম্পদ যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর ২০০৯ সালে আইলা এসে উপকূলের লবণাক্ততার ক্ষতকে আরও গভীর করে দিয়ে যায় চিরস্থায়ীভাবে। একের পর এক ফণী, বুলবুল, আম্পান আর ইয়াস এসে আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে বারবার। সর্বশেষ ২০২৪ সালের রেমাল আবারও প্রমাণ করেছে যে প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে আমাদের প্রস্তুতি এখনও কতটা ঠুনকো।
লবণাক্ততা এখন নীরব ঘাতক। ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকূলের সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও কৃষিজমির উর্বরতা হারানো। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জেলাগুলোতে ধান চাষ এখন দিবা স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের কাছে। মানুষ বাধ্য হয়ে আদি পেশা ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে কেবল দুমুঠো ভাতের আশায়। উপকূলের ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রের পেটে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে। এটি আমাদের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত।
আরো পড়ুন:-বাচ্চা আমদানিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা: সিন্ডিকেট ভীতিতে পোল্ট্রি খাত!
আশ্রয়কেন্দ্রের অন্ধকার ও নারীদের লড়াই
আশ্রয়কেন্দ্র কি আসলেও নিরাপদ? ঘূর্ণিঝড়ের সময় মানুষ জান বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটলেও সেখানে নারীদের জন্য পরিবেশ এখনও অত্যন্ত শোচনীয়। পর্যাপ্ত আলো, পৃথক ওয়াশরুম আর নিরাপত্তার অভাবে সেখানে নারীরা প্রতিনিয়ত ভায়োলেশনের শিকার হচ্ছেন। বেলার গবেষক রেহনুমা নূরাইন বলছেন, দুর্যোগের সময় শিশুরা দীর্ঘকাল শিক্ষা ও মানসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত থাকে। আইনি কাঠামোর অস্পষ্টতার কারণে এই সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত থেকে যাচ্ছে যা মেনে নেওয়া কঠিন।
শিশুদের শৈশব আজ বিপন্ন। আশ্রয়কেন্দ্রে কাটানো দিনগুলোতে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ থমকে যায় পুষ্টিহীনতা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে। ডায়রিয়া, চর্মরোগ আর জলজনিত নানা ব্যাধি উপকূলের প্রতিটি ঘরে এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আর শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা জরুরি। কেবল ত্রাণ দিয়ে এই মানবিক সংকট দূর করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান।
আরো পড়ুন:-ভোটের মাঠে রক্তের ছাপ! বাড়ছে সংঘাত ও জনআতঙ্ক
অভিযোজন ভাবনা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
শুধু ত্রাণে মুক্তি নেই। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে আমাদের জিডিপির ১ শতাংশ প্রতি বছর দুর্যোগে হারিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা আর বরফ গলনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আমাদের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন হবে প্রায় ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আমাদের উন্নয়নের দর্শন ও কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন না আনলে এই লড়াইয়ে টিকে থাকা অসম্ভব।
রাজনৈতিক সদিচ্ছাই আসল চাবিকাঠি। ১১টি জলবায়ু ‘চাপ অঞ্চল’ চিহ্নিত করা হলেও মাঠপর্যায়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জি-২০ দেশগুলোর গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের দায়ভার বইতে হচ্ছে উপকূলের নিরিহ মানুষকে। উপকূলীয় বাঁধগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে শক্তিশালী করা এবং স্থায়ী পুনর্বাসনই এখন সময়ের দাবি। অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে আমাদের পিছু হটার আর কোনো পথ খোলা নেই। আরো জানতে ভিজিট করুন।