নিজের ক্রেনেই চাপা পড়লেন বাংলাদেশি! মালয়েশিয়ায় মর্মান্তিক মৃত্যু - Trend Bd

নিজের ক্রেনেই চাপা পড়লেন বাংলাদেশি! মালয়েশিয়ায় মর্মান্তিক মৃত্যু

মালয়েশিয়ায় বিলবোর্ড লাগাতে গিয়ে লাশ হলেন বাংলাদেশি! মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রবাসে শোকের ছায়া

প্রবাসে আরও এক করুণ মৃত্যু। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে কাজ করতে গিয়ে নিজের চালানো ক্রেনের নিচেই চাপা পড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন এক ভাগ্যাহত বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। জালান পেরাক এলাকায় গত শুক্রবার রাতে যখন সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘটে যায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি। বিলবোর্ড ঠিক করার মতো সাধারণ একটি কাজ যে এভাবে প্রাণ কেড়ে নেবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে গিয়ে আজ তিনি নিজেই ইতিহাসের পাতায় এক বিষাদময় অধ্যায় হয়ে রইলেন।

দুর্ঘটনার বর্ণনা ছিল ভয়াবহ। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে ওই প্রবাসী শ্রমিক একটি ‘স্পাইডার লিফট’ ক্রেন দিয়ে রাস্তার পাশের বিলবোর্ডে কাজ করছিলেন। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে ক্রেনটি চালানোর সময় হঠাৎ সেটি ফুটপাতের কোনো এক অংশে আটকে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যেই দানবীয় ক্রেনটি উল্টে যায় এবং ঠিক তার নিচেই চাপা পড়েন আমাদের এই ভাই। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষের চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও ক্রেনের ওজন ছিল মানুষের শক্তির ঊর্ধ্বে। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি স্বপ্নভঙ্গের গল্প।

যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি ভাগ্যের পরিহাস?

তদন্তে বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। কুয়ালামপুর ট্রাফিক পুলিশের প্রধান এসিপি মোহাম্মদ জামজুরি জানিয়েছেন, ক্রেনটি উল্টে যাওয়ার সময় পাসে থাকা দুটি ব্যক্তিগত গাড়িও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। ভাগ্যক্রমে গাড়ির ভেতরে থাকা যাত্রীরা অক্ষত থাকলেও বাংলাদেশি চালক নিজেকে বাঁচাতে পারেননি বিন্দুমাত্র। কুয়ালামপুর হাসপাতালের একজন চিকিৎসক দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। যান্ত্রিক এই যুগে মানুষের জীবনের দাম যেন এখন চিপসের প্যাকেটের চেয়েও সস্তা হয়ে গেছে। প্রতিটি প্রবাসীর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। দুর্ঘটনার পরপরই কুয়ালালামপুর পুলিশ ওই ক্রেনটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের খোঁজে তল্লাশি শুরু করেছে এবং তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। শহরটিতে ওই ধরণের ভারী যন্ত্রপাতি চালানোর বৈধ অনুমতি ছিল কি না, সেটি এখন বড় আইনি জিজ্ঞাসার বিষয়। যদি কর্তৃপক্ষের অবহেলা থাকে, তবে সেই দায়ভার কে নেবে এবং নিহতের পরিবার কি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাবে? শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার রক্তের দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আইন যেন এখানে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে।

আরো পড়ুন:-ট্রাম্পের বড় ঘোষণা: ভারতের ওপর শুল্ক ৫০% থেকে কমে ১৮%

প্রবাসীদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?

বাংলার ঘরে ঘরে কান্নার রোল। এই খবরটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর ওই প্রবাসীর পরিবারে যে শোকের মাতম শুরু হয়েছে, তার ভার সহ্য করার ক্ষমতা কারও নেই। কত আশা নিয়ে তিনি বিদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন, আর আজ ফিরে আসবেন কফিনে বন্দী হয়ে নিথর দেহে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অবদান অনস্বীকার্য হলেও তাদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় থাকা মা কিংবা স্ত্রীর কাছে এই মৃত্যু যেন এক অনন্ত আক্ষেপ। প্রবাসীদের প্রতিটি ফোঁটা রক্ত যেন আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জ্বালানি।

শোক যেন শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। কুয়ালালামপুরের ব্যস্ত রাস্তায় পড়ে থাকা সেই রক্তমাখা ক্রেনটি যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে আমাদের প্রবাসীদের কঠিন সংগ্রামের বাস্তব চিত্র। তারা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটেন কেবল দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। অথচ সামান্য একটি যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা অব্যবস্থাপনা কেড়ে নেয় তাদের মূল্যবান জীবন মুহূর্তের মধ্যে। আমাদের দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় হয়ে এসব মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো নিশ্চিত করতে হবে। কোনো মৃত্যুই যেন স্রেফ ফাইলবন্দী হয়ে হারিয়ে না যায়।

আরো পড়ুন:- কলকাতায় বসে ক্ষমতা দখলের ছক: কী করছেন হাসিনা?

শেষ বিদায়ের করুণ সুর

স্মৃতিরা আজ বড্ড অবাধ্য। সহকর্মীরা জানিয়েছেন, ওই বাংলাদেশি যুবক অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ছিলেন সবার কাছে। তার অকাল মৃত্যুতে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে গভীর শোক আর আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে সর্বত্র। বিদেশের মাটিতে একাকী কাজ করার যে ঝুঁকি, তা আজ আবারও প্রমাণিত হলো এই শোকাতুর ঘটনার মধ্য দিয়ে। মৃতদেহটি দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে নিজ গ্রামে দাফন করা হবে। বিদেহী এই আত্মার শান্তি কামনা করছে পুরো জাতি।

অপেক্ষা এখন কেবল কফিনের। পরবাসের এই ধূসর জীবনে যারা রক্ত পানি করে রেমিট্যান্স পাঠান, তাদের এমন করুণ বিদায় আমরা কেউ চাই না। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালয়েশিয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা আশা করি, তদন্ত শেষে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করা হবে এবং নিহতের পরিবারকে ন্যায়বিচার দেওয়া হবে। প্রবাসীদের জয়গান যেন কেবল তাদের পাঠানো ডলারের অঙ্কেই সীমাবদ্ধ না থাকে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। লাল-সবুজের পতাকার মান রাখতে গিয়ে যারা জীবন দেন, তারা অমর। আরো জানতে ভিজিট করুন।

Leave a Comment