জেলের ঘানি টানছেন বিমানের এমডি! নতুন দায়িত্বে ড. হুমায়রা। - Trend Bd

জেলের ঘানি টানছেন বিমানের এমডি! নতুন দায়িত্বে ড. হুমায়রা।

আকাশপথে বড় ঝড় উঠেছে। দেশের প্রধান বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যখন নিজেই জঘন্য অপরাধের দায়ে শ্রীঘরে যান, তখন পুরো জাতির মাথা লজ্জায় নিচু হয়ে যায়। খবরটি সত্যিই পিলে চমকানো। গত মঙ্গলবার বিকেলে সরকার এক জরুরি আদেশের মাধ্যমে বিতর্কিত এমডি সাফিকুর রহমানকে সরিয়ে ড. হুমায়রা সুলতানাকে নতুন দায়িত্ব দিয়েছে।

বিমানে এখন পরিবর্তনের হাওয়া। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে আসা এই ঘোষণাটি যেন এক দমকা হাওয়ার মতো সব ওলটপালট করে দিয়েছে। ড. হুমায়রা বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন। তাকে এখন নিজের পদের পাশাপাশি বিমানে এমডি ও সিইও হিসেবে বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে হবে।

কেন এই নাটকীয় রদবদল?

অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। গৃহকর্মী নির্যাতনের মতো অমানবিক অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর থেকে সাফিকুর রহমানের ক্যারিয়ারে কালো মেঘ জমেছিল। তার অপরাধ ছিল ক্ষমার অযোগ্য। সরকার তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বন্দিশালায় কাটছে এমডির দিন। গত রোববার রাতে উত্তরার বাসভবন থেকে সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রীকে পুলিশ গ্রেফতার করলে চারদিকে ছি ছি পড়ে যায়। তারা এখন অন্ধকার প্রকোষ্ঠের বাসিন্দা। আদালতের নির্দেশে তাদের এখন কারাগারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে, যা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জন্য চরম অবমাননাকর।

নির্যাতনের শিকার সাধারণ মানুষ। শুধু এমডি দম্পতিই নয়, এই মামলায় তাদের বাসার আরও দুই গৃহকর্মী রূপালী ও সুফিয়াকেও গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মানুষের ঘর যেখানে নিরাপদ হওয়ার কথা, সেখানে এমন পাশবিকতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির ভেতরের কুৎসিত চেহারাটি আবারও প্রকাশ্যে এনেছে।

ডানা ভাঙা বিমানে নতুন কাণ্ডারি

হাল ধরলেন ড. হুমায়রা। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান ইমেজ সংকটে ভোগে, তখন একজন দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তার বিকল্প আর কিছুই হতে পারে না। তিনি একজন অভিজ্ঞ আমলা। প্রশাসনিক কাজে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বিমানে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে সবাই আশা করছেন।

চ্যালেঞ্জটা কিন্তু অনেক পাহাড়সমান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগে থেকেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে হাসির পাত্র হয়ে আছে। হুমায়রাকে এই জঞ্জাল পরিষ্কার করতে হবে। তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, শুদ্ধি অভিযান কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং বাস্তবেও সম্ভব।

আস্থার সংকট দূর করাই মূল লক্ষ্য। বিমানের প্রতিটি উইং এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে। এই ধারণা পাল্টানো সহজ নয়। নতুন এমডিকে অত্যন্ত শক্ত হাতে এই ডানা ভাঙা বিমানের হাল ধরতে হবে যাতে এটি আবার সম্মানের সাথে আকাশে উড়তে পারে।

আরো পড়ুন:-বিমান ভাড়া নিয়ন্ত্রণ: সরকারকে কড়া সতর্কবার্তা দিল আয়াটা

সাফিকুর রহমানের উত্থান ও করুণ পতন

শুরুটা হয়েছিল সোনালি স্বপ্নে। ১৯৮৬ সালে ট্রেইনি কমার্শিয়াল অফিসার হিসেবে বিমানের চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন এই আলোচিত সাবেক কর্মকর্তা সাফিকুর রহমান। তার ক্যরিয়ার গ্রাফ ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি বিমানের প্রশাসন, মানবসম্পদ, বিপণন ও বিক্রয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব শাখায় পরিচালক হিসেবে দাপটের সাথে কাজ করেছেন।

বিদেশেও ছিল তার বিচরণ। গ্রিস, সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে তিনি কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি অবসরে যান। কিন্তু অবসরের সাত বছর পর ২০২৪ সালে তাকে পুনরায় চুক্তিতে এমডি হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

যোগ্যতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল কুৎসিত চেহারা। যে মানুষটি সারা জীবন নিয়মনীতির কথা বলে বড় বড় পদে আসীন ছিলেন, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে এতোটা অমানবিক হতে পারেন তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তার এই পতন কেবল একটি ব্যক্তির পতন নয়, বরং এটি ক্ষমতার দম্ভের এক করুণ পরিণতি। এটি সবার জন্য একটি বড় শিক্ষা।

আরো পড়ুন:-এক যুগ পর ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট শুরু করল বিমান

বিমানের ভবিষ্যৎ ও জনগণের প্রত্যাশা

মানুষ এখন বিচার চায়। কেবল পদ থেকে সরিয়ে দিলেই হবে না, বরং গৃহকর্মী নির্যাতনের এই মামলার সুষ্ঠু বিচার হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। অপরাধী যেই হোক, আইন যেন তার নিজস্ব গতিতে চলে। ভুক্তভোগী সেই অসহায় নারী যেন ন্যায়বিচার পান, সেটাই এখন পুরো দেশবাসীর একমাত্র কাম্য ও দাবি।

বিমানে আসুক প্রকৃত স্বচ্ছতা। বিমানের নিয়োগ থেকে শুরু করে টিকিট কেনাবেচা পর্যন্ত সর্বত্র যে সিন্ডিকেট রাজত্ব করছে, তা ভাঙার এখনই উপযুক্ত সময়। নতুন এমডি কি পারবেন এই দেয়াল ভাঙতে? সাধারণ মানুষ চায় একটি নির্ভরযোগ্য বিমান সংস্থা, যেখানে কোনো দালালের দৌরাত্ম্য থাকবে না এবং ফ্লাইট সময়মতো ছাড়বে।

স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়নি। আমরা চাই বাংলাদেশ বিমান বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক এবং আমাদের জাতীয় পতাকাকে গর্বের সাথে আকাশে বহন করুক। কোনো অপরাধী যেন আর কখনোই এই পবিত্র লাল-সবুজ পতাকার তলে বড় পদে বসতে না পারে। শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকুক এবং আকাশপথ হয়ে উঠুক সবার জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক।

বিমানের এই সংকটকালে ড. হুমায়রা সুলতানার নিয়োগ একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন করলেই হবে না, কাঠামোগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। ডানা ভাঙা এই বিমান কি সত্যিই সুবাতাস নিয়ে ফিরতে পারবে? উত্তরটা সময়ের হাতে তোলা থাকল, কিন্তু সাধারণ মানুষ এখন আর কোনো অজুহাত শুনতে চায় না। আরো জানতে ভিজিট করুন।

Leave a Comment