৩৯ বছর পর দার্জিলিংয়ে ফিরল সেই রুট, পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়! - Trend Bd

৩৯ বছর পর দার্জিলিংয়ে ফিরল সেই রুট, পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়!

৩৯ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান! দার্জিলিংয়ের সেই রহস্যময় ট্রেকিং রুট এখন পর্যটকদের নাগালে

পাহাড়ের রাণী দার্জিলিং মানেই বাঙালির কাছে এক চিরচেনা আবেগ। কুয়াশা ঘেরা ম্যাল, কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালী আভা আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা—এই নিয়েই আমাদের পাহাড় প্রেম। কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষদের জন্য এবার এক অবিশ্বাস্য খবর এসেছে। দীর্ঘ ৩৯ বছর পর আবার উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো দার্জিলিংয়ের ঐতিহাসিক এক ট্রেকিং রুট। যা পর্যটকদের কাছে এতদিন ছিল কেবলই এক ধূসর স্মৃতি।

১৯৮৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে যে পথে কোনো পর্যটকের পা পড়েনি, সেই পথই এখন খুলে দেওয়া হয়েছে। গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে নিরাপত্তার খাতিরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল দার্জিলিং হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের (HMI) এই প্রশিক্ষণের রাস্তাটি। অবশেষে পাহাড়ের পর্যটন শিল্পে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে জিটিএ (GTA) এই রুটটি পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইতিহাসের পাতায় রাগেরুং রুট

এই রুটটি কেবল একটি সাধারণ হাঁটার পথ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ের ইতিহাস। এক সময় এই পথটি দার্জিলিং হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের প্রধান প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র ছিল। পর্বতারোহণের প্রাথমিক পাঠ নিতে হবু পর্বতারোহীরা এই ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেন। কিন্তু ১৯৮৬ সালে পাহাড়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে থমকে যায় এই যাতায়াত।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে স্থানীয় হোম-স্টে মালিকরা এবং পর্যটন ব্যবসায়ীরা এই রুটটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২০১১ সাল থেকে রাগেরুং হোম-স্টে ওনার অ্যাসোসিয়েশন রুটটি চালুর চেষ্টা করলেও প্রশাসনিক জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি দার্জিলিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘মেলো টি ফেস্টিভ্যাল’-এর হাত ধরে এই অচলায়তন ভেঙেছে।

১২ কিলোমিটারের রোমাঞ্চকর যাত্রা

নতুন করে চালু হওয়া এই ট্রেকিং রুটটি শুরু হয় দার্জিলিং শহরের প্রাণকেন্দ্র চৌরাস্তা বা ম্যাল থেকে। সেখান থেকে রুংডুং খোলা বা পাহাড়ি নদী পার হয়ে পর্যটকরা পৌঁছাবেন মনোরম রাগেরুং চা বাগানে। মোট ১২ কিলোমিটারের এই পথটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। পথের দুপাশে সবুজের সমারোহ আর হিমালয়ের বিশুদ্ধ বাতাস আপনার সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেবে।

এই ট্রেকে অংশ নেওয়া মানে কেবল হাঁটা নয়, বরং পাহাড়ের নিস্তব্ধতাকে অনুভব করা। শহরের কোলাহল থেকে দূরে পাইন আর ওক গাছের ছায়ায় ঘেরা এই পথটি আপনাকে এক শান্ত ও শীতল অনুভূতি দেবে। সম্প্রতি ‘ডি-হাইক’ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৫০ জন পর্বতারোহী এই পথে হেঁটে রুটটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছেন।

আরো পড়ুন:-কুয়েতে পাক-ভারতকে ধসিয়ে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ! সোহাগের তান্ডব

রাগেরুং: চা বাগান আর হোম-স্টের স্বর্গ

ট্রেকিংয়ের শেষ গন্তব্য রাগেরুং চা বাগান এলাকায় বর্তমানে ২২টি সুসজ্জিত হোম-স্টে রয়েছে। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা পর্যটকদের আতিথেয়তার জন্য সব সময় প্রস্তুত। রাগেরুং হোম-স্টে ওনার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেরিং শেরপা জানান, এটি পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ একটি জায়গা। ২০১১ সাল থেকে তারা এখানে পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ করছেন।

এখানে থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পাহাড়ের গ্রামীণ জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখা। অর্গানিক খাবার, স্থানীয় সংস্কৃতি আর চা বাগানের নির্জনতা এই জায়গাকে অনন্য করে তুলেছে। যারা ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে একটু নিরিবিলিতে কাটাতে চান, তাদের জন্য রাগেরুং হতে পারে সেরা ডেস্টিনেশন।

পর্যটন বিকাশে জিটিএ-র নতুন উদ্যোগ

দার্জিলিংয়ের পর্যটনকে কেবল ম্যাল বা টাইগার হিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিতে চাইছে জিটিএ। পুরনো এবং পরিত্যক্ত পর্যটন কেন্দ্র ও রুটগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ। এর ফলে কেবল পর্যটকরাই উপকৃত হবেন না, বরং স্থানীয় কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে।

জিটিএ-র পর্যটন বিভাগ জানিয়েছে, তারা এই রুটটিকে আরও আধুনিক এবং পর্যটনবান্ধব করার পরিকল্পনা করছে। পথের মধ্যে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা এবং সাইনেজ বা দিকনির্দেশক বোর্ড বসানোর কাজও দ্রুত শুরু হবে। তেনজিং নোরগের স্মৃতি বিজড়িত এই পথে ভ্রমণ করা পর্যটকদের জন্য হবে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

আরো পড়ুন:-নিষিদ্ধ হচ্ছে না টিকটক! যুক্তরাষ্ট্রে নতুন মালিকানায় বাজিমাত।

কিভাবে যাবেন এবং প্রস্তুতি

দার্জিলিং শহর থেকে খুব সহজেই আপনি এই ট্রেকিং শুরু করতে পারেন। সকালে চৌরাস্তা থেকে রওনা দিয়ে বিকেলের মধ্যেই রাগেরুং পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। তবে সাথে একজন গাইড রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পাহাড়ি রাস্তা হওয়ায় আরামদায়ক জুতো এবং পর্যাপ্ত জল সাথে রাখা জরুরি। শীতের সময় গেলে গরম কাপড় নিতে ভুলবেন না।

রাগেরুং পৌঁছানোর পর আপনি চাইলে সেখানে রাত কাটাতে পারেন অথবা গাড়িতে করে আবার দার্জিলিং শহরে ফিরে আসতে পারেন। তবে যারা প্রকৃতির স্বাদ পূর্ণভাবে নিতে চান, তাদের জন্য এক রাত রাগেরুংয়ের হোম-স্টেতে থাকা বাধ্যতামূলক। চা বাগানের মাঝখানে রাত কাটানো আর ভোরে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙার অভিজ্ঞতা আপনার সারাজীবন মনে থাকবে।

৩৯ বছর পর এই রুট খুলে যাওয়া কেবল পর্যটনের উন্নতি নয়, এটি পাহাড়ের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাওয়ার প্রতীক। দার্জিলিংয়ের পর্যটন মানচিত্রে এই সংযোজন আগামী দিনে আরও বেশি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষকে পাহাড়ের টানে টেনে আনবে। আপনি যদি পাহাড় ভালোবাসেন এবং গতানুগতিক পথের বাইরে কিছু খুঁজছেন, তবে এই শীতেই ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহাসিক রাগেরুং রুটে। আরো জানতে ভিজিট করুন।

Leave a Comment