আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ঢাকা-১০ আসনে বইছে উৎসবের আমেজ। ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, কলাবাগান ও হাজারীবাগ নিয়ে গঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ এখন তুঙ্গে। দীর্ঘ বছর পর ভোটারদের মধ্যে ফিরেছে নির্বাচনের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্দীপনা। বিএনপি এবং ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন রাজপথ থেকে অলিপলি। একদিকে ধানের শীষের শেখ রবিউল আলম, অন্যদিকে দাঁড়িয়ে পাল্লার জসীম উদ্দীন সরকার—লড়াই এখন সমানে সমান।
ঢাকা-১০ আসনে ভোটের হাওয়া: রবিউল বনাম জসীম, কার পাল্লা ভারী? শেষ হাসি হাসবে কে?
ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচনী মাঠে এখন ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে মূল আলোচনা আবর্তিত হচ্ছে বিএনপি ও ১০ দলীয় জোটকে কেন্দ্র করে। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা অ্যাডভোকেট মো. জসীম উদ্দীন সরকার, যিনি ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে পাল্লা প্রতীক পেয়েছেন। এর বাইরে এবি পার্টির ব্যারিস্টার নাসরীন সুলতানা মিলি ঈগল প্রতীক নিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন।
এই আসনের রাজনীতিতে বড় একটি চমক ছিল সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে নিয়ে। তাকে ঘিরে অনেক রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেননি। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই সরে দাঁড়ানোয় ঢাকা-১০ আসনের ভোটের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়েছে। ভোটারদের মতে, লড়াই এখন মূলত দুই প্রধান শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বিএনপি ও জোটের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা
নির্বাচনী প্রচারণায় কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন। বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তিনি সরাসরি ভোটারদের বাসায় যাচ্ছেন এবং লিফলেট বিতরণ করছেন। রবিউল আলম ঢাকা পোস্টকে জানান, “বিগত কয়েক বছরে এ দেশের মানুষ অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। এবার তারা পরিবর্তন চায়। আমি জয়ী হলে রাজনীতিতে কোনো অনৈতিক কাজ হতে দেব না। ব্যবসায়ীরা যাতে নির্ভয়ে ব্যবসা করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা আমার প্রধান কাজ হবে।”
অন্যদিকে, জসীম উদ্দীন সরকারও পিছিয়ে নেই। বিশাল মিছিল ও পথসভার মাধ্যমে তিনি তার সাংগঠনিক শক্তির জানান দিচ্ছেন। ১০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমর্থন চাচ্ছেন। জসীম উদ্দীনের দাবি, সাধারণ মানুষের ভালোবাসা এবং দোয়া তার সাথে আছে। পরিবর্তনের যে জোয়ার তৈরি হয়েছে, তাতে দাঁড়িয়ে পাল্লার বিজয় সুনিশ্চিত বলে তিনি মনে করেন।
আরো পড়ুন:- তারুণ্যনির্ভর এনসিপির ইশতেহার: থাকছে মোবাইল আইসিইউ চমক
ভোটারদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও ভোগান্তি
ঢাকা-১০ আসনের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উন্নয়ন ও প্রতিশ্রুতির ভিড়ে তাদের কিছু মৌলিক সমস্যা এখনো অমীমাংসিত। বিশেষ করে মশার উপদ্রব এই অঞ্চলের একটি স্থায়ী যন্ত্রণার নাম। কলাবাগান ও হাজারীবাগের বাসিন্দারা জানান, সিটি কর্পোরেশন ওষুধ দিলেও মশার হাত থেকে নিস্তার মিলছে না। এছাড়া ধানমন্ডি ও কলাবাগান এলাকায় শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ এবং বিনোদনকেন্দ্রের অভাব রয়েছে।
নিউমার্কেট ও পান্থপথ এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে সৃষ্ট যানজট এখন নিত্যদিনের সমস্যা। ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের জন্য এই জ্যাম বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটাররা বলছেন, তারা এমন একজনকে প্রতিনিধি হিসেবে চান, যিনি কেবল ভাষণ দেবেন না, বরং এই ছোট ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সমাধান করবেন। ধানমন্ডির বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, “আমরা চাই শিশুদের খেলার জায়গা আর যাতায়াতের নিরাপত্তা। প্রার্থীরা অনেকে অনেক কথা বলেন, তবে কাজ কতটুকু হয় তা দেখার বিষয়।”
নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
দীর্ঘদিন পর ঢাকা-১০ আসনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। কলাবাগানের বাসিন্দা রমজান আলীর কণ্ঠে শোনা গেল সেই প্রত্যাশার কথা। তিনি বলেন, “গত কয়েকটা নির্বাচনে তো মানুষ ভোটই দিতে পারে নাই। এবার যদি পরিবেশ ভালো থাকে, তবে অবশ্যই ভোট দিমু। প্রার্থীরা তো আসতেছে, দেখি শেষ পর্যন্ত কী হয়।”
ব্যবসায়ী এবং সাধারণ পেশাজীবীরা চাইছেন স্থিতিশীলতা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ করা তাদের মূল দাবি। শেখ রবিউল আলম এ বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেছেন, কেউ যদি রাজনীতির পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটাররা এখন প্রার্থীদের সব কথা শুনছেন এবং বিচার-বিশ্লেষণ করছেন। শেষ পর্যন্ত তাদের রায়েই নির্ধারিত হবে কে হচ্ছেন এই আসনের নতুন অভিভাবক।
আরো পড়ুন:-নগদে ম্যানেজার পদে নিয়োগ ২০২৬: সপ্তাহে ২ দিন ছুটি ও বোনাস
রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ পথচলা
ঢাকা-১০ আসনের এই লড়াই কেবল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার নয়, এটি এখন রাজনৈতিক কৌশলেরও। শেখ রবিউল আলমের ধানের শীষের যেমন বিশাল জনসমর্থন রয়েছে, তেমনি জসীম উদ্দীন সরকারের সুসংগঠিত দলীয় ভোটব্যাংক রয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সমীকরণ ততই জটিল হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেষ মুহূর্তের কৌশল এবং সাধারণ ভোটারের নীরব সমর্থনেই লুকিয়ে আছে জয়ের চাবিকাঠি।
এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঢাকা-১০ এর ফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন কেবল ১২ ফেব্রুয়ারির অপেক্ষা। সেই দিনই পরিষ্কার হবে, ধানমন্ডি-হাজারীবাগের মানুষ তাদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কার ওপর আস্থা রাখছেন। তবে উৎসবমুখর এই পরিবেশ যেন শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, সেটিই এখন সবার প্রার্থনা। আরো জানতে ভিজিট করুন।