বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের জন্য নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আদালত বিসিবিকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা অবিলম্বে উচ্চ আদালতের আগের দেওয়া রায়ের আলোকে যৌন হয়রানি বিরোধী নীতিমালা কার্যকর করে। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন।
নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা দিতে বিসিবির ব্যর্থতা! হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ ও নতুন রুল জারি
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারী অ্যাথলেটদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে নারী ক্রিকেটারদের জেন্ডার-সংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিসিবির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সদস্য জাহানারা আলমকে কেন্দ্র করে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আদালত এই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন, কেন নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে বিসিবির এই ব্যর্থতাকে বেআইনি ঘোষণা করা হবে না।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালত শুধু রুল জারি করেই ক্ষান্ত হননি, বরং অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের মাধ্যমে যৌন হয়রানি বিরোধী নীতিমালা দ্রুত কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতেও বিসিবিকে বলা হয়েছে।
জাহানারা আলমের অভিযোগ ও বিসিবির ধীরগতি
নারী ক্রিকেটার জাহানারা আলমের পক্ষ থেকে আসা যৌন হয়রানির অভিযোগটি ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। অভিযোগ ওঠার পর বিসিবি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও দীর্ঘ সময়েও কোনো প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। এই ধীরগতি এবং বিসিবির গৃহীত পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হতে পারেননি সচেতন নাগরিক সমাজ।
এই প্রেক্ষাপটে সাবরিনা সুলতানা নামের এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটে অভিযোগ করা হয় যে, বিসিবি নারী ক্রিকেটারদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। রিট আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন আহমেদ অসীম। তিনি যুক্তি দেন যে, কার্যকর নীতিমালা না থাকায় নারী ক্রিকেটাররা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে থাকছেন।
আরো পড়ুন:-আপিলেও খারিজ! নির্বাচন করতে পারবেন না মঞ্জুরুল মুন্সী
যৌন হয়রানি বিরোধী নীতিমালা কার্যকরের বাধ্যবাধকতা
হাইকোর্ট তার আদেশে স্পষ্ট করেছেন যে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। বিশেষ করে ক্রীড়া সংস্থায় যেখানে নারীরা সরাসরি কাজ করছেন, সেখানে এটি আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। আদালত বিসিবিকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা আগের রায়ের নির্দেশনার আলোকে অবিলম্বে একটি শক্তিশালী নীতিমালা কার্যকর করে।
যৌন হয়রানি কেবল শারীরিক লাঞ্ছনা নয়, বরং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার মাধ্যমে একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিতে পারে। আদালত মনে করেন, বিসিবির মতো একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান যদি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি করে, তবে সেটি নারী ক্রিকেটের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই নীতিমালা কার্যকর করার পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতা আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন আদালত।
নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট গত কয়েক বছরে বিশ্বমঞ্চে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এশিয়া কাপ জয় থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ—সবখানেই তারা প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু অন্দরমহলে যদি ক্রিকেটাররা অনিরাপদ বোধ করেন, তবে নতুন খেলোয়াড়রা ক্রিকেটে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
বিসিবির বিরুদ্ধে রিটকারী পক্ষ দাবি করেছেন, মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরের পরিবেশও সুন্দর হওয়া জরুরি। জাহানারা আলমের মতো একজন সিনিয়র ক্রিকেটারের সাথেই যদি এমন ঘটনা ঘটে এবং বিচার পেতে দেরি হয়, তবে জুনিয়র ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা কোথায়? এই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরো পড়ুন:-শালীর স্বামীকে কেন খুন করল দুলাভাই? ফটিকছড়ি হত্যাকাণ্ডের ভয়ংকর রহস্য।
আদালতের রুল ও পরবর্তী পদক্ষেপ
হাইকোর্টের জারি করা রুলে বিসিবি এবং সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের উত্তর দিতে বলা হয়েছে। নিরাপদ ক্রীড়া পরিবেশ নিশ্চিতে বিসিবির নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তার সন্তোষজনক জবাব দিতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ অনুযায়ী নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বিসিবিকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, হাইকোর্টের এই আদেশ বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। এর ফলে বিসিবি কেবল প্রশাসনিক সংস্কারই করবে না, বরং ক্রিকেটারদের জন্য একটি মানসিক ও সামাজিকভাবে নিরাপদ বলয় তৈরি করতে বাধ্য হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে নারী ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে হাইকোর্টের এই হস্তক্ষেপ একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। নারী ক্রিকেটারদের সম্মান ও নিরাপত্তা কোনোভাবেই আপসের বিষয় হতে পারে না। বিসিবিকে এখন কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করলেই হবে না, বরং দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা নারী ক্রিকেটারদের পাশে আছে। আদালত এই মামলার ওপর পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য সময় নির্ধারণ করেছেন, যার দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো দেশের ক্রীড়াঙ্গন। আরো জানতে ভিজিট করুন।