জেফ্রি এপস্টেইন—এক সময়কার প্রভাবশালী মার্কিন ধনকুবের, যার নাম আজ বিশ্বজুড়ে কেবল কুখ্যাত এক যৌন অপরাধী হিসেবেই পরিচিত। অভিজাত মহলে ওঠাবসা আর বিলাসী জীবনযাপনের আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন পাচারের এক অন্ধকার জগৎ। ২০১৯ সালে কারাগারে তার রহস্যময় মৃত্যু হলেও, ২০২৬ সালে এসেও ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নিয়ে নতুন সব তথ্যে কেঁপে উঠছে বিশ্ব রাজনীতি।
কে এই কুখ্যাত জেফ্রি এপস্টেইন? ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে ব্রিটিশ রাজপরিবার—যাদের নামে কাঁপছে বিশ্ব
জেফ্রি এপস্টেইন কেবল একজন অপরাধীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক রহস্যময় চরিত্র। নিউইয়র্কের সাধারণ এক স্কুল শিক্ষক থেকে ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী হয়ে ওঠা এই ব্যক্তির জীবন ছিল সিনেমাটিক। কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল শত শত কিশোরীর কান্নার দীর্ঘশ্বাস। সম্প্রতি ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাস হওয়া “এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট”-এর অধীনে প্রকাশিত নথিগুলো আবারও তাকে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে এসেছে।
গণিত শিক্ষক থেকে ওয়াল স্ট্রিটের জাদুকর
এপস্টেইনের শুরুটা হয়েছিল নিউইয়র্কের ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে। সেখানে এক ধনকুবের শিক্ষার্থীর বাবার চোখে পড়ার পর তার ভাগ্য বদলে যায়। মাত্র চার বছরের মধ্যে তিনি বিখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক ‘বেয়ার স্টার্নস’-এর অংশীদার হন। ১৯৮২ সালে নিজের কোম্পানি চালু করার পর তিনি বিলিয়ন ডলারের মালিক বনে যান। নিজের ব্যক্তিগত দ্বীপ, বিলাসবহুল বিমান আর অট্টালিকা দিয়ে তিনি বশ করেছিলেন বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের।
ট্রাম্প ও ক্লিনটনদের সঙ্গে সখ্যতা
এপস্টেইনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সামাজিক নেটওয়ার্ক। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সময় তাকে “দারুণ মানুষ” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প দাবি করেন, অপরাধ প্রকাশের অনেক আগেই তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও তার সখ্যতা বা অনুদান গ্রহণ করেছিল। এমনকি ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আরো পড়ুন:- ভারতের তেল কেনা নিয়ে বড় খবর! মোদিকে নিয়ে যা বললেন ট্রাম্প
যৌন পাচারের বিশাল নেটওয়ার্ক ও ‘শতাব্দীর চুক্তি’
২০০৫ সালে প্রথমবার এপস্টেইনের বিরুদ্ধে ১৪ বছর বয়সী এক মেয়েকে নিগ্রহের অভিযোগ ওঠে। পাম বিচে তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ অসংখ্য মেয়ের ছবি পায়। কিন্তু ২০০৮ সালে তৎকালীন প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি বিতর্কিত সমঝোতা চুক্তি বা ‘শতাব্দীর চুক্তি’র মাধ্যমে তিনি বড় শাস্তি এড়িয়ে যান। যাবজ্জীবনের বদলে মাত্র ১৮ মাসের কারাদণ্ড পান তিনি, তাও আবার দিনের বেলা অফিস করার সুযোগসহ। এই ঘটনা মার্কিন বিচার ব্যবস্থার এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও রাজকীয় উপাধি হারানো
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় শিকার সম্ভবত ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু। এপস্টেইনের সঙ্গে তার মেলামেশার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ভার্জিনিয়া জিউফ্রে নামে এক তরুণী অভিযোগ করেন, তাকে ১৭ বছর বয়সে প্রিন্সের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয়েছিল। এই বিতর্কের জেরে ২০২৫ সালে এসে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর রাজকীয় উপাধি পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়।
রহস্যময় মৃত্যু ও অমীমাংসিত নথি
২০১৯ সালে আবারও গ্রেপ্তার হন এপস্টেইন। কিন্তু বিচারের আগেই নিউইয়র্কের এক সুরক্ষিত কারাগারে তার মরদেহ পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ একে আত্মহত্যা বললেও তার পরিবারের আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মনে এখনো সন্দেহ রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাট ও অন্যান্য মানবাধিকার কর্মীরা দাবি করছেন, বিচার বিভাগ এখনো অনেক নথি গোপন রেখেছে।
আরো পড়ুন:-ফ্রিল্যান্সিং শিখে মাসে ৫০,০০০ টাকা আয় করার পূর্ণাঙ্গ গাইড
গিসলেন ম্যাক্সওয়েল: অপরাধের প্রধান সহযোগী
এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তার সাবেক সঙ্গী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলকে ২০২১ সালে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত তাকে এপস্টেইনের জন্য মেয়ে শিকার করার কারিগর হিসেবে সাব্যস্ত করে। ম্যাক্সওয়েলের সাজা হওয়ার মাধ্যমে এই কুখ্যাত নেটওয়ার্কের এক বড় অধ্যায় শেষ হলেও, প্রকাশিত নথিগুলো এখনো অনেক হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে রেখেছে। আরো জানতে ভিজিট করুন।