ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কুমিল্লা-৪ আসনের রাজনীতির মাঠে বড়সড় ওলটপালট হয়ে গেল। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার সব পথ এবার পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ঋণ খেলাপির অভিযোগে তার মনোনয়ন বাতিলের যে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন নিয়েছিল, সর্বোচ্চ আদালত তা বহাল রেখেছেন। এর ফলে আসন্ন নির্বাচনে তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন না।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর লিভ টু আপিল আবেদনটি খারিজ করে দেন। এর আগে হাইকোর্টও তার রিট আবেদন খারিজ করেছিলেন। আদালতের এই আদেশের ফলে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির নির্বাচনী সমীকরণ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
আদালতের চূড়ান্ত রায় ও আইনি লড়াই
মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা নিয়ে আইনি লড়াই বেশ কয়েকদিন ধরেই চলছিল। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় তার বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপির অভিযোগ তোলেন ওই আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় গত ১৭ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন (ইসি) মুন্সীর মনোনয়ন বাতিল করে দেয়।
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। কিন্তু গত ২১ জানুয়ারি হাইকোর্ট সেই রিট সরাসরি খারিজ করে দিলে তিনি আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হন। আজ আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখায় তার সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন এ যাত্রায় শেষ হয়ে গেল। আদালতে মুন্সীর পক্ষে ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম। অন্যদিকে হাসনাত আবদুল্লাহর পক্ষে আইনি লড়াই চালান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন লিপু।
আরো পড়ুন:-আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পূর্বাভাস: কোন কোন জেলা ভিজবে?
কুমিল্লা-৪ আসনের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী এই আসনের প্রভাবশালী নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য। তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়ায় নির্বাচনী মাঠে এখন বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এখন একটাই আলোচনা—বিএনপি কি এখানে অন্য কাউকে সমর্থন দেবে, নাকি আসনটি হাতছাড়া হয়ে যাবে?
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আদালতের এই রায়ে হতাশা দেখা দিয়েছে। তবে বিরোধী শিবিরের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে অভিযোগকারী হাসনাত আবদুল্লাহ এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর জন্য মাঠ এখন অনেকটাই ফাঁকা। এই আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের যে সম্ভাবনা ছিল, তা এখন দ্বিমুখী বা একপাক্ষিক লড়াইয়ে রূপ নিতে পারে।
ঋণ খেলাপির অভিশাপ ও নির্বাচনী আইন
বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণ খেলাপি হওয়া একটি বড় অযোগ্যতা। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী যদি ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করেন, তবে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলোর উচিত মনোনয়ন দেওয়ার আগেই প্রার্থীর ঋণ সংক্রান্ত তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মতো একজন সিনিয়র নেতার ক্ষেত্রে এমন আইনি জটিলতা দলের ভাবমূর্তিকেও কিছুটা প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এই রায় দেশের অন্যান্য ঋণ খেলাপি প্রার্থীদের জন্যও একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
আরো পড়ুন:-এনটিআরসিএ ৭ম বিশেষ নিয়োগের ফল প্রকাশ: সুপারিশ পেলেন ১১৭১৩ জন
ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ও দেবীদ্বারের পরিবেশ
দেবীদ্বারের সাধারণ ভোটাররা এই রায়কে মিশ্রভাবে দেখছেন। অনেকের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি ভালো উদাহরণ। আবার মুন্সীর সমর্থকরা মনে করছেন, এটি তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার একটি কৌশল। তবে আদালতের রায় হওয়ার পর দেবীদ্বার এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থিতা বাতিলের ফলে ব্যালট পেপার মুদ্রণ এবং অন্যান্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এখন পরিবর্তন আনা হবে। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ যাবে। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি হাইকমান্ড এই আসন নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত নেয় কি না।
লিভ টু আপিল এবং পরবর্তী ধাপ
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আপিল বিভাগের লিভ টু আপিল খারিজ হয়ে যাওয়ার পর সাধারণত আর কোনো আইনি প্রতিকার অবশিষ্ট থাকে না। তবে তাত্ত্বিকভাবে রিভিউ আবেদনের সুযোগ থাকলেও নির্বাচনের এই অল্প সময়ের মধ্যে তার নিষ্পত্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে কুমিল্লা-৪ আসনে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এটি একটি বড় ধাক্কা।
আরো পড়ুন:-আয়কর রিটার্নের সময় বাড়ল: শেষ সময় ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার এই আসনটি এখন সারা দেশের মানুষের নজর কাড়ছে। বিএনপি এই আসনে তাদের ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে পারে কি না, নাকি হাসনাত আবদুল্লাহর এনসিপি নতুন কোনো চমক দেখায়, তা দেখার জন্য ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আরো জানতে ভিজিট করুন।