বদলির আদেশ ছেঁড়া সেই এনবিআর কর্মকর্তার বরখাস্ত প্রত্যাহার - Trend Bd

বদলির আদেশ ছেঁড়া সেই এনবিআর কর্মকর্তার বরখাস্ত প্রত্যাহার

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যুগ্ম কর কমিশনার মাসুমা খাতুনের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকলেও তাকে কেবল লঘুদণ্ড দিয়ে স্বপদে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়েও পার পেলেন এনবিআর কর্মকর্তা মাসুমা! লঘুদণ্ড দিয়ে বরখাস্ত প্রত্যাহার

সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও এনবিআরের এই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেল। প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সামনে বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলার মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের দায়ে তাকে দীর্ঘ সময় বরখাস্ত রাখা হয়েছিল। তবে বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাকে বড় কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। বরং মূল বেতন দুই ধাপ কমিয়ে তাকে পুনরায় চাকরিতে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনাটি প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত বছর জুলাই মাসে এনবিআরের কর বিভাগের ৮ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে একসাথে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। মাসুমা খাতুন ছিলেন তাদেরই একজন। সাম্প্রতিক এই আদেশের ফলে তিনি আবারও কর বিভাগে কাজ করার বৈধতা পেলেন।

কী ঘটেছিল সেদিন?

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২৪ জুন। সেই দিন এনবিআরের জারি করা একটি বদলির আদেশ পাওয়ার পর মাসুমা খাতুন রাজধানীর রাজস্ব ভবনের সামনে অবস্থান নেন। উপস্থিত ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে তিনি সেই সরকারি আদেশটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেন।

এনবিআরের দৃষ্টিতে এই আচরণ ছিল চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং চাকরি শৃঙ্খলার পরিপন্থি। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এমন আচরণে পুরো দপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়। এরপর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়।

লঘুদণ্ড ও বরখাস্ত প্রত্যাহার

দীর্ঘ তদন্ত এবং ব্যক্তিগত শুনানি শেষে কর্তৃপক্ষ কঠোর শাস্তির বদলে লঘুদণ্ডের সিদ্ধান্ত নেয়। আদেশে বলা হয়েছে, মাসুমা খাতুনের মূল বেতন গ্রেড দুই ধাপ অবনমিত করা হয়েছে। অর্থাৎ তার বেতন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দুই ধাপ নিচে থাকবে। সরকারি পরিভাষায় একে ‘লঘুদণ্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকরের পাশাপাশি তার ওপর থাকা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে তিনি এখন থেকে কর অঞ্চল-২ বা নির্ধারিত কোনো দপ্তরে যোগ দিতে পারবেন। বরখাস্তকালীন সময়ের বকেয়া পাওনা বা সুবিধার বিষয়ে আদেশে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকলেও তার স্বপদে ফেরা এখন নিশ্চিত।

আরো পড়ুন:-বাণিজ্য মেলায় ৩৯৩ কোটির রেকর্ড বিক্রি: পর্দা নামল আসরের

এনবিআরে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি

মজার বিষয় হলো, এটি এনবিআরে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত সপ্তাহেই একই প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধেও শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। একের পর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের লঘুদণ্ড দিয়ে স্বপদে ফিরিয়ে আনায় দপ্তরের অভ্যন্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

নিচুতলার কর্মচারীদের অনেকের মতে, এই ধরনের নমনীয়তা প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যদি প্রকাশ্যে সরকারি আদেশ অবজ্ঞা করেও চাকরিতে টিকে থাকতে পারেন, তবে সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে ভুল বার্তা পৌঁছাতে পারে।

শৃঙ্খলা বিধিমালা বনাম বাস্তবতা

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯ এবং শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী, অসদাচরণের শাস্তি হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণের বিধান রয়েছে। বিশেষ করে প্রকাশ্য অবাধ্যতা বা শৃঙ্খলা ভঙ্গকে ‘গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু মাসুমা খাতুনের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি কেন নমনীয় হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত আদেশে কৈফিয়তের জবাব এবং ব্যক্তিগত শুনানির বিষয়গুলো পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে দেওয়া যুক্তি বা পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের শাস্তির পথে না গিয়ে বেতন কমানোর মাধ্যমেই বিষয়টির ইতি টেনেছে।

আরো পড়ুন:-সোনার দামে অবিশ্বাস্য পতন: এক ভরিতে কমল ৩০ হাজার টাকা!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও জনমনে প্রতিক্রিয়া

২০২৫ সালের সেই ভিডিওটি এক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। মানুষ একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এমন আচরণ দেখে অবাক হয়েছিলেন। এখন তার স্বপদে ফেরার খবরে আবারও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নাকি প্রশাসনিক প্রভাব—কোন কারণে শাস্তি এত শিথিল হলো, তা নিয়ে নেটিজেনরা মন্তব্য করছেন।

অন্যদিকে এনবিআরের কাজে গতি ফেরাতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয়তার কথাও ভাবছে কর্তৃপক্ষ। কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বর্তমানে এনবিআর বেশ চাপের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষ কর্মকর্তাদের লঘুদণ্ড দিয়ে কাজে ফেরানোকে প্রশাসনিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।

এনবিআরের এই সিদ্ধান্তটি সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা রক্ষার ইতিহাসে একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। বদলির আদেশ অবজ্ঞার শাস্তি হিসেবে বেতন অবনমন যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। তবে মাসুমা খাতুনের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে এনবিআরের সেই উত্তাল অধ্যায়ের আপাতত সমাপ্তি ঘটল। এখন দেখার বিষয়, স্বপদে ফিরে তিনি তার পেশাদারিত্বের মাধ্যমে হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে পারেন কি না। আরো জানতে ভিজিট করুন।

Leave a Comment