বাচ্চা আমদানিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা: সিন্ডিকেট ভীতিতে পোল্ট্রি খাত! - Trend Bd

বাচ্চা আমদানিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা: সিন্ডিকেট ভীতিতে পোল্ট্রি খাত!

মুরগির বাচ্চা আমদানিতে বড় নিষেধাজ্ঞা: সিন্ডিকেট রাজত্ব নাকি সাধারণ খামারিদের মরণফাঁদ?

ভয়াবহ খবর পোল্ট্রি খাতে। সরকার এখন হুট করেই মুরগির বাচ্চা আমদানির পথ চিরতরে বন্ধ করার এক বিতর্কিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যা সাধারণ খামারিদের জন্য অশনিসংকেত। কেন এই সিদ্ধান্ত? ২০২৬ সালের নতুন নীতিমালায় বাণিজ্যিক বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধের প্রস্তাব আসায় এখন সারা দেশের প্রান্তিক খামারিদের মনে নতুন করে এক বিশাল সিন্ডিকেট আতঙ্ক দেখা দিচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে গুটিকয়েক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন এই খাতের সাথে জড়িত সাধারণ মানুষগুলো।

কেন এই হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্ত?

সরকার স্বনির্ভর হতে চায়। তারা বলছে দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতেই আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলার এই সাহসী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি কি সম্ভব? কিন্তু বাস্তবতা বলছে অন্য কথা, কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে আমদানির বিকল্প ছাড়াই সব চাহিদা মেটানো যায়। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে বাজারে বাচ্চার তীব্র সংকট তৈরি হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

পরিসংখ্যানের দিকে একটু তাকানো যাক। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মুরগির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৬৮৩.৯৩ লাখের মতো যা গত কয়েক বছরে তরতর করে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৬০.৭০ লাখে। এই বিশাল উল্লম্ফন কী নির্দেশ করে? এটি প্রমাণ করে যে আমাদের পোল্ট্রি খাতের বিস্তার কতটা দ্রুত ঘটছে এবং এই খাতের মূল চাবিকাঠি হলো সময়মতো মুরগির বাচ্চার সরবরাহ নিশ্চিত করা। সরবরাহ চেইন যদি একবার ভেঙে পড়ে তবে পুরো দেশের প্রোটিন চাহিদাই এক বিশাল ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সিন্ডিকেটের থাবায় কি পকেট কাটবে সাধারণ মানুষের?

সবার মুখে এখন একটাই প্রশ্ন। আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে বাজারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে গুটিকয়েক বড় বড় কোম্পানির হাতে যারা চাইলেই যখন তখন বাচ্চার দাম বাড়িয়ে দিতে পারবে। এটি কি কাম্য? বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ক্ষুদ্র খামারিরা বড় কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে পড়বেন। তারা এখন থেকেই ভয় পাচ্ছেন যে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হবে যা প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিদের টিকে থাকাকে প্রায় অসম্ভব করে তুলবে।

সিন্ডিকেটের ভয় কেন এতো বেশি? আমরা অতীতেও দেখেছি কীভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ডিম এবং মুরগির মাংসের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যা মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। বড় কোম্পানিগুলো যদি একচেটিয়া ব্যবসা শুরু করে তবে ছোট খামারিরা বাজার থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এর ফল হবে মারাত্মক কারণ তখন ভোক্তা পর্যায়ে ডিম এবং মাংসের দাম আকাশচুম্বী হবে আর মুনাফা গুনবে কেবল কয়েকটি প্রভাবশালী পরিবার।

আরো পড়ুন:-ভোটের মাঠে রক্তের ছাপ! বাড়ছে সংঘাত ও জনআতঙ্ক

নীতিমালার ধোঁয়াশা ও প্রশাসনিক জটিলতার পাহাড়

খসড়া নীতিমালায় আছে শুভংকরের ফাঁকি। সেখানে বাণিজ্যিক বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করা হলেও গ্র্যান্ড প্যারেন্ট বা জিপি স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে যা বড় কোম্পানিগুলোর জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আমদানির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র’ বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে এবং সেই সিদ্ধান্ত কে নেবে তা নিয়ে কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত নীতিমালায় দেওয়া হয়নি। প্রশাসনিক লালফিতার দৌরাত্ম্যে যখন সিদ্ধান্ত আসতে দেরি হবে তখন মাঠের খামারিরা হয়তো তাদের শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে পথে বসে যাবেন।

পোল্ট্রি উৎপাদন একটি দীর্ঘমেয়াদী চক্র। জিপি স্টক আমদানি করে সেগুলো বড় করা এবং এরপর হ্যাচিং ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন করতে কয়েক মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায় বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন। এর মাঝে কোনো বিপর্যয় ঘটলে কী হবে? যদি কোনো মড়ক লাগে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে জিপি স্টকের ক্ষতি হয় তবে বিকল্প কোনো উৎস না থাকায় পুরো দেশের পোল্ট্রি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তাৎক্ষণিক বাচ্চা আমদানির কোনো পথ খোলা না রাখাটা কি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়?

ক্ষুদ্র খামারিদের কান্নার আওয়াজ কি পৌঁছাবে সচিবালয়ে?

একজন মাঝারি খামারির কথা ভাবুন। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে নির্দিষ্ট সময়ে বাচ্চা না পেলে পুরো একটি ব্যাচ থেকে কোনো উৎপাদন পাওয়া সম্ভব হয় না যা তাকে ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলে। সরকার কি তাদের কথা ভাবছে? আমদানির সুযোগ থাকলে অন্তত সংকটের সময় চড়া দামে হলেও বাচ্চা কিনে উৎপাদন চালু রাখা যেত কিন্তু এখন সেই শেষ আশার আলোটুকুও নিভে যেতে বসেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের যদি এভাবে মাঝরাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় তবে গ্রামীণ অর্থনীতি এক বিশাল ধাক্কা খাবে।

ডিম উৎপাদনের চিত্রটিও বেশ আশাব্যঞ্জক ছিল। ২০১৫-১৬ সালে ডিমের উৎপাদন যেখানে ছিল ১১৯১.২৪ কোটি সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৪০.৬৫ কোটিতে যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এই গতি কি ধরে রাখা যাবে? বাচ্চা সরবরাহ যদি অনিয়মিত হয়ে পড়ে তবে ডিমের বাজারে যে অস্থিরতা দেখা দেবে তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের প্রশাসনের আছে কি না তা নিয়ে জনমনে বড়সড় সংশয় রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রোটিনের সবচেয়ে সহজলভ্য উৎসটি এখন হুমকির মুখে।

আরো পড়ুন:-ঢাকা-১০ আসনে রবিউল বনাম জসীম: ভোটের লড়াইয়ে জিতবে কে?

বিশেষজ্ঞদের কড়া হুঁশিয়ারি ও বাস্তব পরামর্শ

শিক্ষাবিদরাও এখন সোচ্চার হয়েছেন। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম মনে করেন যে আমদানি নিষিদ্ধ করার আগে আমাদের জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো তৈরি করা উচিত ছিল। আমরা কি আসলেই প্রস্তুত? বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমানও একই কথা বলছেন যে আগে দেখতে হবে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে পূর্ণ চাহিদা মেটানো আদৌ সম্ভব কি না। খামারিরা ন্যায্য দামে নিয়মিত বাচ্চা পাচ্ছেন কি না তা নিশ্চিত না করে এমন কঠোর আইন করাটা কি বোকামি নয়?

আশি লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার জানিয়েছেন যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ শিল্পের সাথে কোটি কোটি মানুষের স্বার্থ সরাসরি জড়িয়ে আছে। হুট করে সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতি হবে কার? শেষ পর্যন্ত এই সব ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাকে যখন তাদের পাতে আর এক টুকরো মুরগির মাংস বা একটি ডিম জুটবে না। তাই ধাপে ধাপে স্বনির্ভরতার দিকে যাওয়াই ছিল সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

আরো পড়ুন:-তারুণ্যনির্ভর এনসিপির ইশতেহার: থাকছে মোবাইল আইসিইউ চমক

আমাদের চাওয়া ও শেষ কথা

টেকসই সমাধান প্রয়োজন সবার আগে। নীতিমালার লক্ষ্য যদি হয় স্বনির্ভরতা তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আগে আমাদের ছোট ও মাঝারি খামারিদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং তাদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল বড়দের সুবিধা দিলে চলবে না। বায়োসিকিউরিটি বা জৈব নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করাও খুব জরুরি যাতে কোনো রোগ সংক্রমণের ভয়ে আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে না হয়। সব পক্ষের মতামত নিয়ে একটি সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করাই এখন সময়ের দাবি।

দেরি হওয়ার আগেই সতর্ক হোন। সরকার যদি তার অবস্থানে অনড় থাকে তবে পোল্ট্রি খাত থেকে সাধারণ খামারিদের প্রস্থান ঠেকানো যাবে না এবং আমরা হারাবো কর্মসংস্থানের এক বিশাল বড় ক্ষেত্র। পোল্ট্রি বাচ্চা উৎপাদন ও বিপণনে যেন কোনো একক গোষ্ঠীর আধিপত্য তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। আমরা চাই একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা যেখানে ছোট-বড় সবাই মিলে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কোনো সিন্ডিকেটের কাছে যেন দেশের খাদ্য খাত জিম্মি না হয় এটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া। আরো জানতে ভিজিট করুন।

Leave a Comment