সৌদি আরবের নাম শুনলেই একসময় চোখে ভাসত কেবল মরুভূমি আর তেলের খনি। কিন্তু বর্তমানের সৌদি আরব তার পর্যটন খাতকে সাজিয়েছে এক ভিন্ন আঙ্গিকে। বিশেষ করে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে রিয়াদ এখন কেবল কর্মসংস্থান নয়, বরং ভ্রমণের এক নতুন ঠিকানা। আর সেই রিয়াদের ঠিক পাশেই অবস্থিত ঐতিহাসিক শহর ‘দিরিয়াহ’, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ফ্লাইটে রিয়াদ পৌঁছে মাত্র ১৫-২০ মিনিটেই আপনি পৌঁছে যেতে পারেন এই প্রাচীন শহরে। উবার বা কারিমের মতো অ্যাপ ব্যবহার করে খুব সহজেই যাতায়াত করা যায় রিয়াদের কেন্দ্র থেকে দিরিয়াহ পর্যন্ত। আধুনিক সৌদি আরবের আভিজাত্য আর প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের ইতিহাস—এই দুয়ের এক অপূর্ব মিশেল হলো এই দিরিয়াহ।
দিরিয়াহ: ইতিহাসের শিকড় ও ইউনেস্কো ঐতিহ্য
দিরিয়াহকে বলা হয় সৌদি আরবের হৃদস্পন্দন। এই শহরটি ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ‘আত-তুরাইফ’-এর আবাসস্থল। রিয়াদ যখন আকাশচুম্বী ভবন আর আধুনিকতার চাকচিক্যে ব্যস্ত, দিরিয়াহ তখন আপনাকে নিয়ে যাবে কয়েক শ বছর আগের সেই কাদা-মাটির তৈরি রাজকীয় প্রাসাদের যুগে। এখানকার স্থাপত্যশৈলী এবং শান্ত পরিবেশ আপনাকে নাগরিক ব্যস্ততা থেকে দেবে এক চিলতে স্বস্তি।
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য দিরিয়াহ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। কারণ, এখানকার আতিথেয়তা অনেকটা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির মতোই উষ্ণ। শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন এবং অতিথিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যে রীতি দিরিয়াহতে দেখা যায়, তা পর্যটকদের মনে নিজের দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়।
আরো পড়ুন:- মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে নিয়োগ ২০২৬: এআই বিভাগে বড় সুযোগ!
মিনজাল: প্রকৃতির কোলে বিলাসবহুল ‘গ্ল্যাম্পিং’
আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দিরিয়াহতে চলবে ‘মিনজাল’ ইভেন্ট। যারা মরুভূমির খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এখানে রয়েছে বিলাসবহুল গ্ল্যাম্পিং ব্যবস্থা। এটি মূলত ক্যাম্পিংয়ের এক রাজকীয় সংস্করণ। যেখানে প্রকৃতির খুব কাছে থেকেও আপনি পাবেন আধুনিক সব সুবিধা।
মিনজালে রয়েছে লাইভ মিউজিক পারফরম্যান্স এবং সৌদি আরবের বিখ্যাত সব শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। শহুরে কোলাহল থেকে দূরে তারাময় রাত উপভোগ করার জন্য মিনজাল বাংলাদেশি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের জন্য সেরা পছন্দ হতে পারে।
আল-হুয়েইত: শিশুদের জন্য এক কাল্পনিক জগত
আপনি যদি পরিবারসহ ভ্রমণ করেন, তবে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের মধ্যে অবশ্যই ‘আল-হুয়েইত’-এ ঘুরে আসতে পারেন। দিরিয়াহর আদ-দাহিয়াহ এলাকায় আয়োজিত এই ইভেন্টটি মূলত শিশুদের জন্য সাজানো হয়েছে। এখানে প্রচলিত লোকগাথা ও গল্পগুলোকে খেলার ছলে জীবন্ত করে তোলা হয়।
শিশুদের জন্য সৃজনশীল কর্মশালা এবং ইন্টারেক্টিভ প্লে এরিয়া থাকায় তারা খেলার মাধ্যমে শিখতে পারে। নিরাপদ ও প্রাণবন্ত এই পরিবেশে বাচ্চারা যখন আনন্দে মেতে ওঠে, অভিভাবকরা তখন দিরিয়াহর নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
আরো পড়ুন:- নরসিংদীতে সাংবাদিকদের বাসে হামলা: ১০ জন গুরুতর আহত!
হাল আল-কুসুর: প্রাসাদের অন্দরমহলে ইতিহাসের যাত্রা
ইতিহাসের প্রতি যাদের প্রবল আগ্রহ, তাদের জন্য ‘হাল আল-কুসুর’ হতে পারে স্বপ্নের মতো একটি জায়গা। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত চলমান এই আয়োজনে দিরিয়াহর প্রাচীন প্রাসাদগুলোর দরজা পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
লাইভ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে এখানে ফুটিয়ে তোলা হয় প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের স্বর্ণালী দিনগুলোর গল্প। তৎকালীন সৌদি নেতৃত্ব, ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে জানতে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকদের জন্যও এটি একটি বিশেষ সুযোগ।
লায়ালি আল-দিরিয়াহ: আভিজাত্যে ঘেরা মায়াবী সন্ধ্যা
২৩ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে শুরু হয় ‘লায়ালি আল-দিরিয়াহ’। এটি মূলত এক অভিজাত ডাইনিং অভিজ্ঞতা। আত-তুরাইফের প্রাচীন দুর্গগুলোর পাদদেশে অবস্থিত এক পাম বাগানে এই আয়োজন করা হয়।
নজরকাড়া আলোকসজ্জা আর খোলা আকাশের নিচে ডিনার করার অনুভূতি এক কথায় অসাধারণ। যারা স্বামী-স্ত্রী বা বন্ধুদের নিয়ে এক রোমান্টিক সন্ধ্যা কাটাতে চান, তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। এখানকার প্রতিটি কোণ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আভিজাত্যের সংজ্ঞা।
আরো পড়ুন:- ভারত-পাক মহারণ আজ: কে যাচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৯ সেমিফাইনালে?
কেন দিরিয়াহ হবে আপনার পরবর্তী গন্তব্য?
বর্তমানে ঢাকা-রিয়াদ রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, ফলে যাতায়াত এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। দিরিয়াহর প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি স্থাপনা আপনাকে নতুন কোনো গল্পের সন্ধান দেবে। এখানকার আতিথেয়তা এতটাই নিখুঁত যে, নিজেকে আপনি বিদেশের মাটিতে কোনো রাজকীয় মেহমান বলে মনে করবেন।
তাছাড়া বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য ছবি তোলার মতো অজস্র নান্দনিক স্পট রয়েছে এখানে। সৌদি আরবের ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখার জন্য দিরিয়াহর কোনো বিকল্প নেই। এ মৌসুমে দিরিয়াহ সেজেছে নতুনের সাজে, যা পর্যটকদের দেবে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার সুযোগ। আরো জানতে ভিজিট করুন।