শীতের বিদায়ঘণ্টা বাজতে না বাজতেই ঢাকার কাঁচাবাজারে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজি। মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ভরা মৌসুমে যেখানে দাম কিছুটা কম ছিল, এখন সরবরাহের ঘাটতি দেখিয়ে পকেট কাটা হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।
শুক্রবার রাজধানীর উত্তরা, আজমপুর ও আব্দুল্লাহপুরসহ বেশ কয়েকটি বড় কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে অস্থিরতার এই চিত্র। শীতকালীন সবজির শেষ সময়ে এসে বাজারের এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নিত্যদিনের খাবারে টান পড়ছে নতুন করে।
কেন হঠাৎ অস্থির সবজির বাজার?
সাধারণত শীতের সময় বাংলাদেশে সবজির সরবরাহ থাকে উপচে পড়া। কিন্তু এবার শীতের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই বাজারে সবজির জোগান কমতে শুরু করেছে। বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারে সবজির জোগান আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
কারওয়ান বাজার বা যাত্রাবাড়ীর মতো বড় পাইকারি আড়তগুলোতে এখন আগের মতো ট্রাক আসছে না। মূলত উত্তরবঙ্গ ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শীতকালীন আগাম সবজি আসা কমে যাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। পাইকারিতে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
আরো পড়ুন:-সোনার দামে বিশাল ধস: এক দিনেই কমলো ১৪,৬০০ টাকা!
আজকের বাজারের সর্বশেষ দরদাম
রাজধানীর উত্তরের বাজারগুলোতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দাম এখন ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সবজির বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
- পেঁপে: প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।
- শালগম: প্রতি কেজি ৬০ টাকা।
- গোল বেগুন: প্রতি কেজি ৮০ টাকা।
- মুলা ও শসা: প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৮০ টাকা।
- গাজর ও টমেটো: গাজর কেজিপ্রতি ৮০ টাকা এবং টমেটো মানভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
- কাঁচামরিচ: প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা (সবচেয়ে বেশি অস্থির)।
- ফুলকপি ও বাঁধাকপি: আকারভেদে প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা।
ক্রেতাদের ক্ষোভ ও পকেট কাটার যন্ত্রণা
উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের কাঁচাবাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা রিপন সরকার তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত সপ্তাহেই যে ফুলকপি ২৫-৩০ টাকায় কিনেছি, আজ সেটি ৫০ টাকার নিচে নামছে না। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে দ্বিগুণ দাম হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, শুধু একটি বা দুটি সবজি নয়, বরং ধনেপাতা থেকে শুরু করে কাঁচামরিচ—সবকিছুর দামই এখন বাড়তি। বাজারে মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম হাঁকাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন এই ক্রেতা।
রিয়াজুল হান্নান নামের আরেকজন ক্রেতা জানান, শীতের মৌসুম শেষ হওয়ার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা জোটবদ্ধ হয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সরবরাহ কমার কথা বলা হলেও বাজারে কিন্তু সবজির অভাব দেখা যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, এটি একটি কৃত্রিম সংকট হতে পারে।
আরো পড়ুন:- নির্বাচনে স্কুল-কলেজ বন্ধ ৪ দিন! বড় সুখবর দিল সরকার
বিক্রেতাদের সাফাই: দোষ পাইকারি বাজারের
বাজারের দাম বাড়ার পেছনে নিজেদের দায় নিতে নারাজ খুচরা বিক্রেতারা। কামারপাড়া কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা তৈয়বুর রহমান বলেন, “আমাদের পাইকারি বাজার থেকেই প্রতিটি সবজি আগের চেয়ে ২০ থেকে ৪০ টাকা বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনে আমরা তো আর লোকসানে বিক্রি করতে পারি না।”
বিক্রেতাদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে গেছে। এর ফলে মাঠ পর্যায় থেকে সবজি ঢাকার বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দাম কয়েক হাত ঘুরে অনেক বেড়ে যায়। শীতের শেষের দিকে এসে এই সংকট প্রতি বছরই কিছুটা দেখা দেয় বলে তাদের দাবি।
শীতকালীন সবজির সংকটে সাধারণ মানুষ
শীতকালীন সবজি বলতে আমরা সাধারণত ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম ও মুলাকেই বুঝি। কিন্তু বর্তমানে এই সবজিগুলোর দামও চড়া। জাতভেদে শিম বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে। আগে শীতের সময়ে আলু ২০-২২ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন সেটি ৩০ টাকার নিচে মিলছে না।
মিষ্টি কুমড়ার মতো সাধারণ সবজিও এখন ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজের ফুল বা কলি, যা শীতের অন্যতম অনুষঙ্গ, সেটিও প্রতি মুঠো ২০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এটি ১০-১৫ টাকায় পাওয়া যেত।
মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস: বাজার মনিটরিংয়ের দাবি
টানা মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই বেড়েছে। চাল, ডাল ও তেলের বাড়তি দামের পর সবজির এমন অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, সরকারি নজরদারি বা বাজার মনিটরিং জোরদার করা না হলে এই রমজানের আগে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা না গেলে সবজির ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কৃষকরা অনেক সময় মাঠ পর্যায়ে দাম পান না, অথচ খুচরা বাজারে এসে সেই সবজি কয়েক গুণ দামে বিক্রি হয়। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমালে ক্রেতা ও কৃষক উভয়ই উপকৃত হবে।
আরো পড়ুন:- বিদেশে উচ্চশিক্ষা ২০২৬: খুব সহজেই স্কলারশিপ ও ভিসা পাওয়ার গোপন টিপস!
সামনের দিনগুলোতে কী হতে পারে?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি নাগাদ শীতের সবজি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে। তখন গ্রীষ্মকালীন সবজি বাজারে না আসা পর্যন্ত এই অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে। তবে সরকার যদি টিসিবির মাধ্যমে বা বাজার তদারকি টিমের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে, তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে ভয় পাবে।
বর্তমানে সাধারণ মানুষের দাবি একটাই—যেকোনো উপায়ে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা। জীবনযাত্রার উচ্চমূল্যের এই সময়ে সবজির বাজার যেন স্বস্তিতে থাকে, সেই প্রত্যাশা সবার। আরো জানতে ভিজিট করুন।