ভূ-রাজনীতির এক নাটকীয় মোড়ে দাঁড়িয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জ্বালানি ও শুল্ক নীতি নিয়ে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভারত এখন থেকে ইরানের বিকল্প হিসেবে ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করবে। স্থানীয় সময় শনিবার (৩১ জানুয়ারি ২০২৬) ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প জানান, ভারত ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির জেরে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়েছে হোয়াইট হাউস। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারি কোনো পর্যায় থেকে ট্রাম্পের এই দাবি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জ্বালানি খাতের এই বড় পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রাম্পের ঘোষণা ও ভারতের নীরবতা
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই ভারতের এই চুক্তির কথা জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে এই চুক্তিটি করেছি।” ট্রাম্পের এই বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতকে ইরান থেকে দূরে রাখা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল যেন তারা ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করে।
তবে ভারত সবসময়ই তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে আসছিল। ট্রাম্পের এই দাবির পর ভারতের প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো এনডিটিভি এবং ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন সূত্র ধরে জানাচ্ছে যে, নয়াদিল্লি এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ অবস্থানে রয়েছে। মোদি সরকার সম্ভবত পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তবেই তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
শুল্ক যুদ্ধ ও জ্বালানি কূটনীতি
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের অন্যতম কারণ হলো শুল্ক। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতের তেল কেনা। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাদের তেল খাতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
ভারতের ওপর এই শুল্কের বোঝা ভারতের রপ্তানি খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জ্বালানি বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই নতুন চুক্তির দাবি আসলে শুল্ক যুদ্ধ প্রশমনের একটি পথ হতে পারে। ভারত যদি সত্যিই ইরান ছেড়ে ভেনেজুয়েলার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে ওয়াশিংটন দিল্লির ওপর থেকে এই কঠোর শুল্ক তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে।
আরো পড়ুন:-সরিষার তেলের ১০টি জাদুকরী উপকারিতা: আজই ব্যবহার শুরু করুন!
মাদুরো অধ্যায় ও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখন চরম অস্থিতিশীল। গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। এর পর থেকেই দক্ষিণ আমেরিকার এই তেলসমৃদ্ধ দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলা থেকে ১৮টি বিশাল তেলের ট্যাংকার লোড হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, লুজিয়ানা এবং মিসিসিপির তেল পরিশোধনাগারে পৌঁছেছে। এটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বর্তমানে ভেনেজুয়েলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে।
চীনের বিদায় এবং ভারতের সম্ভাব্য প্রবেশ
ভেনেজুয়েলার তেল বাজারের সমীকরণ এখন পুরোপুরি উল্টে গেছে। মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত বা অপহৃত হওয়ার আগে চীন ছিল ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা। প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল তেল চীনে রপ্তানি হতো। কিন্তু গত জানুয়ারি মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চীনে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি একদম শূন্যে নেমে এসেছে।
ঠিক এই শূন্যস্থানেই ভারত প্রবেশ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে দীর্ঘ সময় টেলিফোনে আলাপ করেন। মাদুরো নিখোঁজ হওয়ার পর এটিই দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের প্রথম আলাপ। ফোনালাপে তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘নতুন উচ্চতায়’ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা মূলত তেলের চুক্তির দিকেই ইঙ্গিত করে।
আরো পড়ুন:-প্রকাশিত হলো ভোকেশনাল নবম শ্রেণির রেজাল্ট: দেখার নিয়ম জানুন
ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় ইরানের গুরুত্ব
ভারত বরাবরই ইরানের তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভৌগোলিক নৈকট্য এবং সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে ইরান ভারতের জন্য সুবিধাজনক অংশীদার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার খড়গ ও ট্রাম্পের মারমুখী নীতির কারণে ইরান থেকে তেল কেনা ভারতের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনলে ভারত একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক থেকে রেহাই পেতে পারে, অন্যদিকে নিজেদের তেলের উৎসগুলোতে বৈচিত্র্য আনতে পারবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায় ভেনেজুয়েলার তেলের গুণগত মান এবং পরিবহন খরচ নিয়ে। ইরানি তেলের তুলনায় ভেনেজুয়েলার তেল অনেক ভারী এবং এটি পরিশোধনের জন্য ভারতীয় রিফাইনারিগুলোতে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।
ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত এবং প্রাচীনতম গণতন্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই জ্বালানি যুদ্ধ কেবল ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের লড়াই। ট্রাম্প চাইছেন ভারতকে সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমা ব্লকের জ্বালানি ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসতে। এতে রাশিয়া ও ইরানের প্রভাব কমবে বলে মনে করে ওয়াশিংটন।
অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী মোদি চাইছেন ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে। ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে, তাই সাশ্রয়ী দামে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা তার প্রধান লক্ষ্য। যদি ভেনেজুয়েলা থেকে ভালো শর্তে তেল পাওয়া যায় এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় পণ্যের শুল্ক কমে, তবে মোদি সরকার এই পথেই হাঁটবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আরো পড়ুন:-সোনার দামে অবিশ্বাস্য পতন: এক ভরিতে কমল ৩০ হাজার টাকা!
উপসংহার: একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু?
ইরানের বদলে ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টি যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়, তবে এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি নির্দেশ করছে যে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কোথায় থাকবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি আর ভারতের নীরবতার মাঝে এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। ২০২৬ সালের এই শীতকালীন রাজনৈতিক উত্তাপ বলে দিচ্ছে, সামনের মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের কোনো বিস্ফোরণ বা সমঝোতা ঘটতে যাচ্ছে। ভারত কীভাবে তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি মোকাবিলা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আরো জানতে ভিজিট করুন ।