সাকিব আল হাসান এবং মোহাম্মদ সালাউদ্দিন—এই দুই নামের কেমিস্ট্রি দেশের ক্রিকেটে সবসময়ই এক অন্যরকম আবেগের জায়গা। মাঠের পারফরম্যান্স কিংবা মাঠের বাইরের বিতর্ক, সব ছাপিয়ে যখন সাকিবের ফেরা নিয়ে কথা ওঠে, তখন ভক্তদের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। সম্প্রতি বিসিবি যখন ঘোষণা দিল তারা সাকিবকে আবার জাতীয় দলে চায়, তখন সবার নজর ছিল সাকিবের ‘গুরু’ সালাউদ্দিনের দিকে। আজ সংবাদ সম্মেলনে তিনি যা বললেন, তা যেন কোটি ভক্তের মনে নতুন করে আশার প্রদীপ জ্বেলে দিল।
সাকিবের ফেরা নিয়ে সালাউদ্দিনের অকপট স্বীকারোক্তি
সাকিব কি ফিরছেন? কোচের মতে, সাকিবের মতো ক্রিকেটারকে যদি কেউ দলে না চায়, তবে সে নির্ঘাত বোকার রাজ্যে বাস করছে। তিনি সাকিবের গুরুত্ব বোঝালেন। সালাউদ্দিন মনে করেন, সাকিব দলে থাকা মানেই একজন বোলার এবং একজন ব্যাটসম্যানকে একসাথে পাওয়া, যা একাদশকে দুর্দান্ত ব্যালেন্স দেয়। সাকিব ফিট থাকলে তাকে ছাড়া দল গঠন করাটা যেকোনো ম্যানেজমেন্টের জন্যই অসম্ভব এক চিন্তা।
তিনি আসলে একাই একশ। সাকিবের ক্যারিয়ারের ৪৪৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৪ হাজারের ওপর রান আর ৭০০-এর বেশি উইকেট তার ইমপ্যাক্ট পরিষ্কার বুঝিয়ে দেয়। দলের ভারসাম্য একাই পাল্টে দেন তিনি। পরিসংখ্যানের পাতায় তাকালে দেখা যায়, যখনই সাকিব দলে থাকেন, বাংলাদেশ দলের জয়ের শতাংশ অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এটি স্রেফ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং সাকিবের উপস্থিতির এক জাদুকরী প্রভাব।
সাকিব মানেই ভরসা। সালাউদ্দিন খুব পরিষ্কার করে বলেছেন যে, সাকিবের মতো লিজেন্ডারি অলরাউন্ডারের বিকল্প খোঁজা মানে খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজা। এটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে। বিসিবি যখন তাকে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তখন টিম ম্যানেজমেন্টের বড় অংশই এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে বলে মনে হয়। কারণ একজন মেন্টর হিসেবে সালাউদ্দিন জানেন, ড্রেসিংরুমে সাকিবের উপস্থিতি তরুণ ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস কতটা বাড়িয়ে দেয়।
আরো পড়ুন:-ভারত-পাক মহারণ আজ: কে যাচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৯ সেমিফাইনালে?
‘অদম্য’ টুর্নামেন্ট ও ইমপ্যাক্ট প্লেয়ারের রহস্য
টুর্নামেন্টটি বেশ জমজমাট হবে। আসন্ন ‘অদম্য’ টুর্নামেন্টে বিসিবি নতুন এক নিয়ম নিয়ে আসছে, যার নাম ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ রুল। এই নিয়মটি নতুন অভিজ্ঞতা। সালাউদ্দিন জানালেন যে, বিশ্বের অনেক দেশে এই নিয়ম আগে থেকেই চালু আছে এবং বাংলাদেশেও এর প্রয়োগ দেখতে তিনি খুব আগ্রহী। ১২ জন খেলোয়াড় খেললে কৌশল সাজানোর ক্ষেত্রে কোচ এবং অধিনায়কদের কাজের পরিধি অনেকটা বেড়ে যাবে।
মাঠে খেলাটা ক্যাপ্টেনের। সালাউদ্দিনের মতে, কোচরা বাইরে বসে কেবল পরিকল্পনা দিতে পারেন, কিন্তু মাঠের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে অধিনায়কের ওপর নির্ভর করে। এটি একটি চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। এই নিয়মে একজন খেলোয়াড়কে মাঝপথে পরিবর্তন করা যায়, যা গেমের মোড় যেকোনো মুহূর্তে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। আইপিএল বা বিগ ব্যাশে আমরা এই নিয়মের কার্যকারিতা দেখেছি, যা ক্রিকেটকে আরও বেশি রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।
খেলোয়াড়দের জন্যও বড় সুযোগ। এই নিয়মের ফলে দলের কম্বিনেশন আরও শক্তিশালী হবে এবং খেলোয়াড়রা ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। সালাউদ্দিন এটি ইতিবাচক দেখছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, আধুনিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে এমন সব নতুন নিয়মের সাথে দ্রুত অভ্যস্ত হওয়া জরুরি। দিনশেষে এই টুর্নামেন্টটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের মানসিক শক্তি পরীক্ষা করার এক বড় মঞ্চ হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ও স্কোয়াড সাজানোর নেপথ্য গল্প
প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। সালাউদ্দিন স্পষ্ট করেছেন যে, বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখেই বর্তমান স্কোয়াডটি অনেক দিন ধরে একসাথে রাখা হয়েছে। সেখানে দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই। খেলোয়াড়রা যেন সেরাটা দেয় এবং এখান থেকে অন্তত কিছু শিখতে পারে, সেটাই কোচ হিসেবে তার প্রধান চাওয়া। পারফরম্যান্স আসা বা না আসা অনেকটা ভাগ্যের ওপর হলেও প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি থাকা চলবে না।
ছেলেরা যেন সেরাটা দেয়। জাতীয় দলের ব্যাকআপ তৈরিতে এই ধরনের টুর্নামেন্টগুলো টনিকের মতো কাজ করে এবং খেলোয়াড়দের নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেয়। এটি এক বিশাল সুযোগ। টানা খেলার মধ্যে থাকলে বোলার এবং ব্যাটসম্যানদের ছন্দ ঠিক থাকে, যা বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে গিয়ে খুব কাজে দেয়। সালাউদ্দিন এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন।
শিখতে পারাই বড় অর্জন। টুর্নামেন্ট শেষে ফলাফল যাই হোক না কেন, যদি ক্রিকেটাররা নিজেদের স্কিল সামান্যতম উন্নত করতে পারে, তবেই এই আয়োজন সার্থক হবে। কোচ হিসেবে তিনি আশাবাদী। সালাউদ্দিন মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট গ্রপের সাথে কাজ করলে তাদের শক্তির জায়গা এবং দুর্বলতাগুলো বোঝা অনেক সহজ হয়। এই বোঝাপড়াই বড় ম্যাচে জয়ের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
আরো পড়ুন:-বিশ্বকাপে ভারত ম্যাচ বয়কট পাকিস্তানের! আইসিসির জরুরি সভা
৪৫ সেরা ক্রিকেটারের লড়াই: কে হাসবে শেষ হাসি?
লড়াই হবে সমানে সমান। তিন দলের এই টুর্নামেন্টে দেশের সেরা ৪৫ জন ক্রিকেটার অংশ নিচ্ছেন, যার মানে প্রতিটি ম্যাচই হবে এক একটি অগ্নিপরীক্ষা। কেউ কাউকে ছাড় দেবে না। এখানে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ তুর্কিও আছে, যারা জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে মরিয়া হয়ে লড়বে। সালাউদ্দিন এই সুস্থ প্রতিযোগিতাকেই সবচেয়ে বড় করে দেখছেন।
প্রতিদিনই একেকটা নতুন সুযোগ। খেলোয়াড়রা যদি বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নেয় তবেই তাদের ক্যারিয়ারের গ্রাফ উপরের দিকে যাবে, নয়তো পতন নিশ্চিত। অবহেলার কোনো জায়গা নেই। কোচ সালাউদ্দিনের মতে, যারা চাপের মুখে শান্ত থেকে পারফর্ম করতে পারবে, তারাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচকদের নজরে আসবে। এই ৪৫ জনের মধ্য থেকেই আগামীর চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটাররা উঠে আসবে বলে ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও মনে করছেন।
সবাই সেরাটা দেবে আশা। সালাউদ্দিন আত্মবিশ্বাসী যে, মাঠে যখন লড়াই শুরু হবে, তখন বন্ধুত্বের চেয়ে নিজের পারফরম্যান্স বড় হয়ে দেখা দেবে। এটি ক্রিকেটের সৌন্দর্য। তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য এটি বড়দের থেকে শেখার সুযোগ, আর বড়দের জন্য এটি নিজের জায়গা ধরে রাখার লড়াই। মাঠের এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখার জন্য ভক্তরাও এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
ক্রিকেট ভক্তদের আবেগ ও সাকিবের ফিটনেস ইস্যু
আবেগ এখানে অনেক বেশি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সাকিবের খেলা দেখতে চায় এবং তার প্রতিটি উইকেটে গ্যালারি যেন ফেটে পড়ে চিৎকারে। সাকিব কেবল একজন খেলোয়াড় নন। সালাউদ্দিনের ভাষায়, সাকিব যদি ফিট থাকে তবে তাকে দলে না নেওয়াটা বোকামি। সাকিবের বর্তমান ফিটনেস লেভেল এবং মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে মাঝেমধ্যে সমালোচনা হলেও তার সামর্থ্য নিয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ নেই।
ফিটনেসই এখন আসল মন্ত্র। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে বয়সের সাথে সাথে ফিটনেসের ওপর বাড়তি নজর দেওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই। সাকিবও এটি ভালো বোঝেন। সালাউদ্দিন মনে করেন, সাকিব জানেন কীভাবে বড় ইভেন্টের আগে নিজেকে তৈরি করতে হয় এবং তিনি সেই লক্ষ্যেই কাজ করছেন। সাকিবের মতো লড়াকু মানসিকতার খেলোয়াড়রা খুব সহজেই প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন।
ভক্তরা চায় দাপুটে প্রত্যাবর্তন। সাকিবের প্রতিটি ফেরা যেন এক একটি রাজকীয় কামব্যাক এবং সালাউদ্দিনের এই সবুজ সংকেত সেই বার্তাই দিচ্ছে। ক্রিকেট প্রেমীরা আবার গর্জন শুনতে চায়। মিরপুরের হোম অফ ক্রিকেটে কিংবা বিদেশের মাটিতে সাকিবের সেই বিখ্যাত স্যালুট দেখার জন্য পুরো দেশ এখন দিন গুনছে। সাকিবের এই ফেরা কেবল ক্রিকেটের জন্য নয়, বরং দেশের ঝিমিয়ে পড়া ক্রিকেট উন্মাদনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলবে।
আরো পড়ুন:-পাকিস্তানি কিপারের কাণ্ডে তোলপাড়! আইসিসির নিয়ম নিয়ে বিতর্ক
শেষ কথা ও আগামীর ভাবনা
বিসিবির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সাকিবকে ফেরানোর এই আলোচনা এবং সালাউদ্দিনের ইতিবাচক মন্তব্য বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এক ইতিবাচক মোড়। অন্ধকার কেটে আলো আসবেই। ‘অদম্য’ টুর্নামেন্ট থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের মিশন—সব জায়গাতেই সাকিবের ছায়া থাকা মানেই বাংলাদেশ দলের জন্য এক বাড়তি শক্তি। আমরা বিশ্বাস করি, সালাউদ্দিনের নির্দেশনায় সাকিব আবার তার স্বরূপে ফিরবেন।
ক্রিকেট জয়ী হোক সবসময়। রাজনীতির মাঠ আর ক্রিকেটের মাঠ এক নয়, আর সাকিব সেটা তার পারফরম্যান্স দিয়েই বারবার প্রমাণ করেছেন। লড়াইটা মাঠের ভেতরেই হোক। সালাউদ্দিনের সেই ‘বোকার রাজ্য’ মন্তব্যটি যেন সবার চোখ খুলে দেয়। আমাদের সেরা সম্পদকে অবহেলা না করে তাকে সম্মানের সাথে বিদায় জানানো বা তার মেধা কাজে লাগানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সাকিবের জন্য শুভকামনা অবিরাম। আরো জানতে ভিজিট করুন।