আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই দুনিয়ায় এখন এক নতুন শোরগোল শুরু হয়েছে। জনপ্রিয় চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি তার উত্তরের উৎস হিসেবে এখন ব্যবহার করছে ইলন মাস্কের বিতর্কিত ‘গ্রকিপিডিয়া’। এই খবরটি প্রযুক্তি বিশ্বে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
ওপেনএআই-এর সর্বশেষ মডেল জিপিটি-৫.২ ব্যবহারকারীদের কিছু অদ্ভুত তথ্যের উৎস হিসেবে এই নতুন বিশ্বকোষের নাম দেখাচ্ছে। অথচ এই গ্রকিপিডিয়া নিয়ে আগে থেকেই অনেক বিতর্ক রয়েছে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা গভীরে গিয়ে দেখব কেন এটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চ্যাটজিপিটির উত্তরে গ্রকিপিডিয়ার এন্ট্রি: কেন এত বিতর্ক?
সম্প্রতি প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি অনেক প্রশ্নের উত্তরে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এক্সএআই (xAI) দ্বারা তৈরি অনলাইন বিশ্বকোষ ‘গ্রকিপিডিয়া’র তথ্য ব্যবহার করছে।
বিষয়টি প্রথম নজরে আসে যখন ব্যবহারকারীরা জিপিটি-৫.২ মডেলের কাছে কিছু নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চান। চ্যাটজিপিটি তার উত্তরের সোর্স হিসেবে সরাসরি গ্রকিপিডিয়াকে রেফারেন্স হিসেবে দেখাচ্ছে। এটি বড় বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে কারণ ইলন মাস্ক ও ওপেনএআই-এর সম্পর্ক এখন মোটেও বন্ধুত্বপূর্ণ নয়।
গত বছরের অক্টোবর মাসে মাস্ক যখন গ্রকিপিডিয়া চালু করেন, তখন তার মূল উদ্দেশ্য ছিল উইকিপিডিয়ার তথাকথিত ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ তথ্যের বিকল্প তৈরি করা। কিন্তু তথ্যগত নির্ভুলতার চেয়ে বিতর্কিত মতাদর্শ প্রচারের জন্য এই সাইটটি দ্রুত কুখ্যাতি পায়। এখন সেই সাইটের তথ্য চ্যাটজিপিটির মতো মূলধারার এআই চ্যাটবটে চলে আসায় তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গ্রকিপিডিয়া কী এবং কেন মাস্ক এটি তৈরি করেছেন?
ইলন মাস্ক দীর্ঘ দিন ধরেই দাবি করে আসছেন যে উইকিপিডিয়া বামপন্থী বা রক্ষণশীল মতাদর্শের বিরুদ্ধে কাজ করে। তার মতে, প্রথাগত তথ্যসূত্রগুলো অনেক সময় সত্য গোপন করে। এই ধারণা থেকেই তিনি গ্রকিপিডিয়া (Grokipedia) তৈরির উদ্যোগ নেন।
এটি মূলত মাস্কের এআই মডেল ‘গ্রক’-এর প্রশিক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী তথ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করার কথা ছিল। তবে চালুর পরপরই দেখা যায়, এর অনেক নিবন্ধ হুবহু উইকিপিডিয়া থেকে কপি করা। শুধু তাই নয়, মাস্কের ‘অ্যান্টি-ওক’ বা কঠোর রক্ষণশীল মানসিকতার প্রতিফলন এখানে স্পষ্ট।
সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয় ছিল গ্রকিপিডিয়ার ভাষা ও বিষয়বস্তু। কিছু নিবন্ধে এইডস সংকটের পেছনে অবাস্তব যুক্তি দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও দাসপ্রথার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন কিছু মতবাদ প্রকাশ করা হয়েছে যা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছে। এর ফলে শুরুতেই এই বিশ্বকোষটি নির্ভরযোগ্যতা হারায়।
দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান: কী দেখা গেল?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এই বিষয়টি নিয়ে একটি গভীর অনুসন্ধান চালিয়েছে। তারা জিপিটি-৫.২ মডেলে ১২টি ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন করে দেখেছে। এর মধ্যে অন্তত ৯টি ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি গ্রকিপিডিয়া থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে।
তবে আশার কথা হলো, চ্যাটজিপিটি সব ক্ষেত্রে এই উৎস ব্যবহার করছে না। ক্যাপিটল হিল হামলা বা এইচআইভি মহামারির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বড় কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে এটি নির্ভরযোগ্য ও প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের তথ্যই দিচ্ছে।
বিপত্তি ঘটছে যখন ইউজাররা অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কোনো ব্যক্তিত্ব বা ঘটনা নিয়ে জানতে চাচ্ছেন। যেমন ইতিহাসবিদ স্যার রিচার্ড ইভান্সকে নিয়ে কিছু প্রশ্নে চ্যাটজিপিটি গ্রকিপিডিয়ার ভুল তথ্য পরিবেশন করেছে। অথচ সেই তথ্যগুলো আগেই গণমাধ্যমগুলোতে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল।
আরো পড়ুন:-আপনার সন্তান কি ঝুঁকিতে? মেটা ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা!
মেকা হিটলার থেকে গ্রকিপিডিয়া: এআই-এর অন্ধকার দিক
ইলন মাস্কের এক্সএআই প্রজেক্টের ট্র্যাক রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। এর আগে তাদের ‘গ্রক’ চ্যাটবটটি নিজেকে ‘মেকা হিটলার’ হিসেবে ঘোষণা করে আলোচনায় এসেছিল। এমনকি এক্স প্ল্যাটফর্মে যৌন বিকৃত ডিপফেক ছবি তৈরির পেছনেও এই প্রযুক্তির ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।
এমন একটি প্ল্যাটফর্মের ডেটাসেট যখন গ্রকিপিডিয়া হিসেবে বিশ্বকোষের রূপ নেয়, তখন তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সমালোচকেরা বলছেন, গ্রকিপিডিয়া আসলে তথ্যের চেয়ে বেশি মতবাদ প্রচার করে। চ্যাটজিপিটি যখন এই বিষাক্ত তথ্যের উৎস ব্যবহার করে, তখন সাধারণ ব্যবহারকারীরা অজান্তেই ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য গ্রহণ করছেন।
ওপেনএআই-এর ব্যাখ্যা ও ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ
এ বিষয়ে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর একজন মুখপাত্র কথা বলেছেন। তিনি জানান, তাদের লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীদের সামনে সব ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ও উন্মুক্ত তথ্য উপস্থাপন করা। তারা কেবল একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর নির্ভর না করে ইন্টারনেটে থাকা সব ধরণের প্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
ওপেনএআই-এর মতে, এটি তথ্যের বিশালতা বা ‘ব্রড পারসপেক্টিভ’ দেওয়ার একটি অংশ। তবে সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তারা মনে করছেন, এআই যদি সঠিক ও ভুল তথ্যের পার্থক্য করতে না পেরে কেবল ‘উন্মুক্ত তথ্য’ হিসেবে সবকিছু গ্রহণ করে, তবে ইন্টারনেটে মিথ্যার পাহাড় তৈরি হবে।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, শুধু চ্যাটজিপিটি নয়, অ্যানথ্রপিকের তৈরি ‘ক্লড’ (Claude) চ্যাটবটও কিছু ক্ষেত্রে গ্রকিপিডিয়ার ছায়া অনুসরণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মানে হলো, ইলন মাস্কের তৈরি করা এই বিতর্কিত ডেটা এখন পুরো এআই ইকোসিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ছে।
আরো পড়ুন:-আইফোন ১৭ প্রো-এর কাছে ধরাশায়ী শাওমি ১৭ প্রো ম্যাক্স! ক্যামেরায় বড় গলদ?
এআই ফিডব্যাক লুপ: তথ্যের নতুন সংকট
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা একে ‘এআই ইনব্রিডিং’ বা ফিডব্যাক লুপ হিসেবে দেখছেন। যখন একটি এআই মডেল অন্য একটি এআই-এর তৈরি করা ভুল তথ্য পড়ে নিজেকে শিক্ষিত করে, তখন সত্যের অপমৃত্যু ঘটে। গ্রকিপিডিয়া যেহেতু এআই জেনারেটেড কন্টেন্টে ভরা, তাই চ্যাটজিপিটি যখন সেখান থেকে তথ্য নিচ্ছে, তখন সেটি একটি ভুল চক্রের জন্ম দিচ্ছে।
ভবিষ্যতে ব্যবহারকারীরা যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় চ্যাটজিপিটির ওপর নির্ভর করবেন, তখন এই গ্রকিপিডিয়ার ভুল রেফারেন্সগুলো বড় ধরণের বিপত্তি ঘটাতে পারে। বিশেষ করে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে যেখানে তথ্যের নিখুঁত হওয়া জরুরি, সেখানে এ ধরণের সোর্স ব্যবহার করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
আপনার করণীয় কী?
চ্যাটজিপিটি বা যেকোনো এআই চ্যাটবট থেকে তথ্য পাওয়ার পর এখন আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যদি দেখেন উত্তরের নিচে ‘Grokipedia’ বা অপরিচিত কোনো উৎসের নাম দেওয়া আছে, তবে অবশ্যই সেটি অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে যাচাই করে নিন।
মনে রাখবেন, এআই একটি টুল বা হাতিয়ার মাত্র। এর বিচারবুদ্ধি নেই। এটি ইন্টারনেটের ডেটা স্ক্র্যাপ করে আপনাকে উত্তর দেয়। তাই তথ্যের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব আপনার নিজেরই। চ্যাটজিপিটি ৫.২-এর এই প্রবণতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ডিজিটাল যুগে তথ্যের নিরাপত্তা কতটুকু ভঙ্গুর।
আরো পড়ুন:-ভুল ইমেইলে ফাঁস হলো আমাজনের ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর
চ্যাটজিপিটি এবং গ্রকিপিডিয়ার এই মেলবন্ধন এআই শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তথ্যের বিশালতা বনাম তথ্যের নির্ভুলতা—এই লড়াইয়ে এখন নির্ভুলতাই সবচেয়ে বেশি হুমকিতে। ওপেনএআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের উচিত তাদের ডেটা সোর্সিং পলিসি বা তথ্য সংগ্রহের নীতি আরও কঠোর করা।
ইলন মাস্কের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার যদি পুরো বিশ্বের এআই তথ্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটি হবে এক নতুন ধরণের ডিজিটাল অন্ধকার যুগ। তাই আমাদের উচিত প্রতিটি তথ্যের উৎস সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং এআই প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো বুঝে একে ব্যবহার করা। আরো জানতে ভিজিট করুন।