লিবিয়ায় বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত হাবীব উল্লাহর যোগদান - Trend Bd

লিবিয়ায় বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত হাবীব উল্লাহর যোগদান

মিশন লিবিয়া শুরু। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনীতে দাপটের সাথে দায়িত্ব পালন করা মেজর জেনারেল মো. হাবীব উল্লাহ এখন লিবিয়ায় বাংলাদেশের নতুন মুখ হিসেবে অফিশিয়াল ইনিংস শুরু করেছেন। সোমবার তিনি যোগ দিলেন। ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাসে যখন তিনি পা রাখলেন, তখন সহকর্মীদের চোখেমুখে ছিল এক নতুন শুরুর প্রত্যাশা ও আনন্দ।

লিবিয়ার মাঠে নতুন ‘ক্যাপ্টেন’ হাবীব উল্লাহ: প্রবাসীদের ভাগ্য কি এবার বদলাবে?

তিনি একজন লড়াকু সৈনিক। দীর্ঘদিনের সামরিক অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া এই মানুষটি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং প্রশাসনিক টেবিলেও নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন বহুবার। প্রজ্ঞাপন এলো কয়েকদিন আগে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্তে অনেকেই মনে করছেন যে লিবিয়ার মতো চ্যালেঞ্জিং দেশে একজন সেনাকর্মকর্তাই বর্তমানে সবচেয়ে যোগ্য কান্ডারি।

লিবিয়া এখন বেশ উত্তপ্ত। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর নানা মেরুকরণের মাঝে লিবিয়া এখনও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য এক রহস্যময় সোনার খনি হিসেবে টিকে আছে। নিরাপত্তা সেখানে প্রধান ইস্যু। নতুন রাষ্ট্রদূতকে এখন একদিকে যেমন শ্রমবাজার বড় করতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে কঠোরভাবে।

কে এই মেজর জেনারেল হাবীব উল্লাহ?

অভিজ্ঞতা তার বড় শক্তি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও স্টাফ পজিশনে কাজ করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। এর আগে তিনি কী করেছিলেন? রাষ্ট্রদূত হওয়ার আগে তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন সব মহলে।

শৃঙ্খলা তার ভূষণ সবসময়। একজন দক্ষ সেনাকর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসনিক জটিলতা সামলানোর সহজাত ক্ষমতা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রাখে সবক্ষেত্রে। লিবিয়া মিশনের জন্য সরকার কেন তাকেই বেছে নিল? উত্তরটা সহজ—সেখানে কূটনীতির পাশাপাশি প্রয়োজন এক অদম্য মানসিক দৃঢ়তা যা কেবল একজন সৈনিকের পক্ষেই দেখানো সম্ভব।

লিবিয়া কেন আমাদের জন্য ‘পাওয়ার প্লে’?

রেমিট্যান্স যোদ্ধারা আমাদের প্রাণ। লিবিয়া একসময় ছিল বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্যগুলোর একটি, কিন্তু যুদ্ধের কারণে মাঝখানে ভাটা পড়েছিল সেই স্রোতে। এখন পরিস্থিতি আবার পাল্টাচ্ছে। তেলের খনি আর নির্মাণাধীন শহরগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিকের প্রয়োজন বাড়ছে যা বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সুযোগ।

চ্যালেঞ্জ কিন্তু কম নয়। অনেক সময় দালালদের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষ লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এটি রুখতে হবে দ্রুত। নতুন রাষ্ট্রদূত হাবীব উল্লাহর জন্য সবচেয়ে বড় ‘গোল’ হবে এই মানবপাচার বন্ধ করা এবং বৈধ পথে শ্রমিক পাঠানোর রাস্তা পরিষ্কার করা।

আরো পড়ুন:-আমিরাতে আজ পবিত্র শবে বরাত: মুক্তির রজনীতে প্রবাসীদের প্রস্তুতি

দূতাবাসে রাজকীয় অভ্যর্থনা ও প্রথম দিন

স্বাগত জানানোর মুহূর্ত ছিল দারুণ। সোমবার লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসে যখন তিনি পৌঁছালেন, তখন তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সবার মাঝেই ছিল এক উত্তেজনা। হাবীব উল্লাহও খুব সাধারণ ভঙ্গিতে সবার সাথে পরিচিত হলেন এবং কাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন।

টিমওয়ার্কই আসল সাফল্যের চাবিকাঠি। তিনি জানেন যে একা কোনো যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়, তাই দূতাবাসের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে কাজ করতে চান তিনি। প্রথম দিনের সেই মিটিংয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—প্রবাসী সেবা যেন হয় হয়রানি মুক্ত। সাধারণ শ্রমিকরা যেন দূতাবাসকে নিজেদের ঘর মনে করতে পারে, সেটিই হবে তার মূল অগ্রাধিকার।

চ্যালেঞ্জ যেখানে সুযোগ সেখানে

মাঠ এখন বেশ পিচ্ছিল। লিবিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আর বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে লিয়াজোঁ রক্ষা করা হবে রাষ্ট্রদূতের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। বুদ্ধিমত্তার সাথে চলতে হবে তাকে। তিনি যদি সঠিকভাবে চাল দিতে পারেন, তবে লিবিয়ার সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং জনশক্তি রপ্তানি আবার সোনালী যুগে ফিরবে।

তথ্যগুলো বেশ চমৎকার তো? বর্তমানে লিবিয়ায় প্রায় এক লাখের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন যারা প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা পাঠাচ্ছেন। এই পরিসংখ্যান আরও বাড়ানো সম্ভব। রাষ্ট্রদূত যদি লিবিয়া সরকারের সাথে নতুন কোনো শ্রম চুক্তি সই করতে পারেন, তবে সেটি হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় ‘উইনিং শট’।

আরো পড়ুন:-কুয়েতে পাক-ভারতকে ধসিয়ে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ! সোহাগের তান্ডব

প্রবাসী কল্যাণ ও রেমিট্যান্সের নতুন দিশা

স্বপ্ন বড় হওয়া চাই। লিবিয়া থেকে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা এখন সময়ের বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ প্রবাসীদের কাছে। হুন্ডি ব্যবসার দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। নতুন রাষ্ট্রদূত যদি স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সাথে সমন্বয় করতে পারেন, তবে প্রবাসীরা নিশ্চিন্তে দেশে টাকা পাঠাতে পারবেন কোনো রকম ঝুঁকি ছাড়াই।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চাই। লিবিয়ার বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের যেকোনো বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকতে হবে দূতাবাসের সবার ভেতরে। হাবীব উল্লাহর সামরিক জীবন তাকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার যে শিক্ষা দিয়েছে, তা তিনি এখন কূটনীতির ময়দানে প্রয়োগ করবেন। এটি কেবল একটি নিয়োগ নয়, এটি লিবিয়ায় থাকা হাজারো মানুষের শেষ ভরসা।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা

পরিবর্তন এখন সব জায়গায়। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্বজুড়ে থাকা দূতাবাসগুলোতে আমূল সংস্কারের কাজ শুরু করেছে যা মানুষের মধ্যে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। লিবিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে একজন মেজর জেনারেলকে পাঠানো সেই কৌশলেরই অংশ। সরকারের লক্ষ্য হলো—বিদেশে বাংলাদেশের হারানো ভাবমূর্তি আবার পুনরুদ্ধার করা।

সততা যেখানে মূল ভিত্তি। মেজর জেনারেল হাবীব উল্লাহর ক্লিন ইমেজ এবং কঠোর পরিশ্রমী স্বভাব সরকারকে এই আস্থার জায়গা করে দিয়েছে যে তিনি ব্যর্থ হবেন না। আমরা সাধারণ মানুষ কেবল এটাই চাই যে লিবিয়ার মাটিতে আমাদের দেশের পতাকা যেন সবসময় গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে ওড়ে। একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় প্রবাসীরা।

আরো পড়ুন:-শবে বরাতে বিশেষ নামাজ ও রোজার বিধান: সহিহ হাদিস কী বলে?

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও আমাদের প্রত্যাশা

অপেক্ষা এখন দেখার পালা। লিবিয়া মিশন কেবল একটি রুটিন কাজ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরির মিশন হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। আমরা চাই নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল। ঢাকা থেকে ত্রিপোলি সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন যা দুই দেশের জন্যই লাভজনক।

আশা কি মরে যায়? না, আশা নিয়েই মানুষ বাঁচে এবং লিবিয়া প্রবাসীরা এখন নতুন রাষ্ট্রদূতের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে সাহায্যের আশায়। হাবীব উল্লাহর নেতৃত্বে লিবিয়া হয়ে উঠবে একটি নিরাপদ কর্মক্ষেত্র। আমরা চাই লিবিয়ার সাথে বাংলাদেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আরও জোরালো হোক আগামীর দিনগুলোতে। আরো জানতে ভিজিট করুন।

Leave a Comment