লন্ডনের কনকনে শীতের মাঝেও এক টুকরো হৃদয়ের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল রিভারসাইড সংলগ্ন এক মিলনায়তনে। সুনামগঞ্জ জেলা সমিতি ইউকের উদ্যোগে আয়োজিত এই আবেগঘন স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল যেন প্রবাসের মাটিতে শেকড়ের টানে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দিনগত রাতে অনুষ্ঠিত এই সভায় উপস্থিত প্রত্যেকেই যেন তাদের প্রিয় মানুষদের স্মৃতিতে বারবার ফিরে যাচ্ছিলেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত সাবেক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী যখন স্মৃতিচারণ করছিলেন, তখন হলের পিনপতন নীরবতাই বলে দিচ্ছিল প্রয়াত এই গুণীজনদের প্রতি প্রবাসীদের ভালোবাসা কতটা গভীর।
লন্ডনে সুনামগঞ্জের নক্ষত্রদের স্মৃতিচারণ: এক আবেগঘন সন্ধ্যার উপাখ্যান
স্মৃতিরা কখনো মরে না। আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া প্রিয় মুখগুলোকে শ্রদ্ধা জানাতে সুনামগঞ্জ জেলা সমিতি ইউকে যে আয়োজন করল, তা লন্ডনের কমিউনিটি ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সুনামগঞ্জের কাদা-মাটির গন্ধ যেন আজ লন্ডনের ব্যস্ত রাজপথেও পাওয়া যাচ্ছিল। আব্দুল আলী রউফ যখন সভাপতির আসন অলংকৃত করলেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল গভীর মমতা আর শ্রদ্ধার ছাপ।
গুণীজনদের সম্মান জানানো আমাদের দায়িত্ব। সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিজিল মিয়া যখন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছিলেন, প্রতিটি নামের সাথে যেন জড়িয়ে আসছিল কয়েক দশকের কাজের ইতিহাস আর সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য। বিশেষ অতিথি সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক তার বক্তব্যে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই নক্ষত্ররাই প্রবাসে আমাদের গর্বের প্রতীক ছিলেন। সাজ্জাদ মিয়া এমবিই থেকে শুরু করে কারি মুহিবুর রহমান শিপন—সবার আত্মার মাগফিরাত কামনায় হাত তুলেছিলেন উপস্থিত শত শত মানুষ।
আরো পড়ুন:- পর্তুগালের পোর্তো বিজনেস স্কুলে ভর্তির ‘গোল’ দিতে এলো ট্রাভেলারকি
সাজ্জাদ মিয়া এমবিই ও অন্য নক্ষত্রদের জীবন গাঁথা
সাজ্জাদ মিয়া ছিলেন কিংবদন্তি। তার ব্রিটিশ এমবিই খেতাব পাওয়ার পেছনে যে কঠোর পরিশ্রম আর মানুষের জন্য ভালোবাসা ছিল, তা আজ নুরুল হক লালা মিয়া ও হরমুজ আলীর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। কমিউনিটির জন্য তিনি ছিলেন এক বটবৃক্ষ। সাবেক চেয়ারম্যান গিয়াস মিয়াকে নিয়ে আলতাফুর রহমান মুজাহিদ যখন স্মৃতিচারণ করছিলেন, উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
আবু সুফিয়ান ছিলেন প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ। ইলিয়াস মিয়া যখন ‘সুফি মিয়া’র বর্ণাঢ্য জীবনের নানা গল্পের ঝুলি খুললেন, পুরো হলরুম যেন তার অদৃশ্য উপস্থিতিতে ভরে উঠেছিল। কাজী রুবি হকের জীবনী ছিল অনুপ্রেরণার। তার স্বামী মুজিবুল হক মনি যখন তার সংক্ষিপ্ত জীবনী বলছিলেন, তখন নারী শক্তির জয়গানে মুখর ছিল অনুষ্ঠানস্থল। মজুমদার মিয়া এবং সৈয়দ নুরুল আমিন হায়দারদের স্মৃতিচারণ করে চন্দন মিয়া ও মোহাম্মদ তারিফ আহমেদরা মনে করিয়ে দিলেন, মানুষ বাঁচে তার কর্মে, বয়সে নয়।
কারি মুহিবুর ও কমিউনিটির শ্রদ্ধা
সুর ফুরিয়ে গেলেও স্মৃতি অমলিন। কারি মুহিবুর রহমান শিপন সম্পর্কে হেলাল মিয়ার বক্তব্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক, কারণ তার কণ্ঠের জাদুতে অনেকেই একসময় বিমোহিত হতেন। তিনি ছিলেন সবার প্রিয়জন। সুনামগঞ্জ জেলা সমিতি আজ কেবল একটি সংগঠন নয়, বরং লন্ডনে বসবাসরত সুনামগঞ্জীদের জন্য এক আত্মার আত্মীয় হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। সাবেক ডেপুটি মেয়র শহিদ আলী এবং ড. সামসুল হক চৌধুরীরা যখন একে একে মঞ্চে আসছিলেন, তখন সবার কণ্ঠে একটাই সুর—প্রয়াতদের দেখানো পথেই এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।
ঐক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নুরুল হক লালা মিয়া ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফখরুল আলম চৌধুরী শামীমের উপস্থিতিতে সভার মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। কোষাধ্যক্ষ আব্দুস সালাম যখন সভার সার্বিক চিত্র তুলে ধরলেন, সবাই অবাক হয়েছিলেন এত বিশাল আয়োজনে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে। আলতাফুর রহমান মুজাহিদের পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে যখন অনুষ্ঠানের শুরু হয়েছিল, এক প্রশান্তি যেন সবার মনে নেমে এসেছিল শুরু থেকেই।
আরো পড়ুন:- মক্কার মুফতি হলেন শায়খ বালিলা! সৌদিতে নতুন বিপ্লব
শেষ কথা: মাগফিরাত ও দোয়া
রাত তখন গভীর হচ্ছিল। সভাপতি আব্দুল আলী রউফ তার সমাপনী বক্তব্যে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই দোয়া মাহফিল কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি আমাদের কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। বিদায়বেলায় সবার চোখে অশ্রু ছিল। সবশেষে যখন প্রয়াতদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হলো, পুরো মিলনায়তনে তখন কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিল। সুনামগঞ্জের এই নক্ষত্ররা হয়তো আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাদের কর্ম চিরকাল লন্ডনের প্রবাসীদের মনে দীপশিখা হয়ে জ্বলবে।
শান্তি আসুক সবার মনে। আজকের এই মাহফিল প্রমাণ করল যে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হলেও মানুষ তার শেকড় আর প্রিয় মানুষদের কখনোই ভুলতে পারে না। সুনামগঞ্জ জেলা সমিতি ইউকে এভাবেই আগামীতেও মানবতার জয়গান গেয়ে যাবে। আল্লাহ যেন পরপারে আমাদের এই প্রিয় মানুষগুলোকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। আমীন। আরো জানতে ভিজিট করুন।